সোমবার ১৯শে আষাঢ় ১৪২৯ Monday 4th July 2022

সোমবার ১৯শে আষাঢ় ১৪২৯

Monday 4th July 2022

বহুস্বর মতামত

নতুন শিক্ষাক্রম কি আমাদের শিক্ষাকে এগিয়ে দেবে?

২০২২-০৬-১৬

রাখাল রাহা

নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে সরকারের শিক্ষাদপ্তরের মন্ত্রী-উপমন্ত্রী-সচিব-কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিক্ষাবিদ ও অধ্যাপক নানা আয়োজনে যা-কিছু বলছেন-লিখছেন, তাতে মনে হচ্ছে এই শিক্ষাক্রম আমাদের শিক্ষার অনেকটা মুক্তির সনদ। এটা আসলেই মুক্তির সনদ কিনা, এতে আমাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত শিক্ষাখাতের পুনর্জন্ম ঘটবে কিনা—এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমাদের একটু কষ্ট করে নিকট অতীতে এদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এরকম আরো যেসব মুক্তির সনদ হাজির করা হয়েছিল, সেগুলোর কিছু কিছু সংক্ষেপে দেখে নেওয়া প্রয়োজন।

 

১.
ক. দেশী-বিদেশী বহু কনসালট্যাণ্ট-বিশেষজ্ঞ-কর্মকর্তা মিলে অনেক বছর গবেষণা করে আশির দশকের শুরুতেই মাধ্যমিক স্তরে হাতেকলমে বিজ্ঞান শেখানোর কথা বলে “এসো নিজে করি” অনুশীলনের বিজ্ঞান বই চালু করা হয়েছিল, যখন দেশের প্রায় কোনো স্কুলে হাতেকলমে বিজ্ঞান শেখানোর উপযোগী ল্যাব বা প্রশিক্ষিত শিক্ষক ছিল না। এর ফল হলো দশ বছরের মধ্যে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী অর্ধেকেরও বেশী কমে গেল। অনেক স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ বন্ধ হয়ে গেল। বিজ্ঞানের সম্ভাবনা বহু বছরের জন্য পিছিয়ে দেওয়া গেল। এরপর সেই মুক্তির সনদ বাতিল করে আবার নতুন প্রকল্প নেওয়া হলেও বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা আর ঘরে ফিরে আসেনি।

 

খ. নকল প্রতিরোধ এবং মূল্যায়নের ত্রুটি কাটানোর কথা বলে অনেক বছর ধরে দেশী-বিদেশী বহু কনসালট্যাণ্ট-বিশেষজ্ঞ-কর্মকর্তা মিলে গবেষণা করে নব্বই দশকের শুরুতে এমসিকিউ প্রবর্তন করে প্রতি বিষয়ে ৫০০টি প্রশ্নের ব্যাংক করে দেওয়া হলো। ৫০০টি এমসিকিউ মুখস্থ করলেই নিশ্চিত ৫০ পাওয়ার ব্যবস্থা এবং লিখিত পরীক্ষায় শূন্য পেলেও পাশ নির্ধারণ করা হলো। এর ফল হলো পাশের হার এক লাফে ৩০-৩৫ থেকে ৬০-৭০ এ পৌঁছে গেল। হাইস্কুলে ছাত্রসংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়তে লাগলো। ছাত্রবেতন আদায় বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষকদের দাবিদাওয়ার আন্দোলন স্তিমিত হলো। এসএসসি-র পাশের চাপ গিয়ে কলেজগুলোতে পড়লো। হাজার হাজার হাইস্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা হতে লাগলো, আর এর পাশাপাশি গণ্ডায় গণ্ডায় গড়ে ওঠা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র যোগান দেওয়াও সম্ভব হলো। এরপর থেকে গুন বৃদ্ধি নয়, পাশের হার বাড়ানো মানেই শিক্ষার মান বাড়ানো হয়ে গেল!

 

গ. আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও আবাসিক অসুবিধা ইত্যাদির কথা বলে উপজেলার বাইরে পরীক্ষাকেন্দ্র সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। ফলে সর্বত্র পরীক্ষাকেন্দ্র খোলার হিড়িক পড়ে গেল। যেসব স্কুলের আয়-ইনকাম কম ও রেজাল্ট খারাপ তারা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় সুযোগ-সুবিধার অগ্রীম নিশ্চয়তা দিয়ে অধিক টাকা নিয়ে নিবন্ধন করিয়ে ক্ষমতা ও প্রশাসনের নানা অন্ধিসন্ধিতে ঘুষ-উৎকোচ দিয়ে কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে গেল। ফলে সেসব কেন্দ্রে নকল শুধু নয়, পাঠ্যপুস্তক-নোটবই সামনে রেখে, একে অপরেরটা দেখে দেখে, একের পরীক্ষা অন্যে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলো। আর এর মাধ্যমে স্কুল, বোর্ড, প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনীতি সবার আয়-ইনকামের সুযোগ সৃষ্টি করা গেল। 

 

ঘ. দেশী-বিদেশী বহু কনসালট্যাণ্ট-বিশেষজ্ঞ-কর্মকর্তা মিলে অনেক গবেষণা করে শিক্ষার্থীদের চিন্তার ক্ষমতা বাড়াতে ও মূল্যায়ন যথাযথ করতে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছিল শূন্য দশকের মাঝামাঝি সময়ে। ফল হলো শিক্ষার্থীরা আরো বেশী নোট-গাইড ও কোচিং নির্ভর হয়ে পড়লো। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও নোটবই-গাইডবই নির্ভর হলো। শিক্ষার্থীরা আরো বেশী-বেশী না বুঝেই লিখতে লাগলো! আর শিক্ষকরা খাতায় কিছু পেলেই নাম্বার দেওয়ার অলিখিত নির্দেশনাও পেতে শুরু করলেন! 

 

ঙ. সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য কম দেখাতে বহু গবেষণা করে ডিভিশন ভিত্তিক ফলাফল থেকে সরে জিপিএ ভিত্তিক ফলাফল নির্ধারণ পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছিল শূন্য দশকেই। ফল হলো জিপিএ-র বাম্পার ফলন! ভালো-মন্দর ভেদ ঘুচিয়ে সবাইকে এক কাতারে এনে সমাজের বেছে নেওয়ার ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হলো। সকল প্রতিযোগিতায় ভালো-মন্দ উভয়ের সমান অংশগ্রহণ সম্ভব করে মন্দর জন্য অসৎ প্রক্রিয়ার সুযোগ উন্মুক্ত রেখে ভালোকে ক্রমাগত পিছিয়ে দেওয়া গেল।

 

চ. বহু ঢোল পিটিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য মাধ্যমিক স্তরে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক পাঠ্যবই সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা হলো, যখন অধিকাংশ স্কুল-কলেজে ল্যাব নেই, বা থাকলেও শিক্ষক নেই বা শিক্ষক থাকলে ল্যাব সারাবছর বন্ধ থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করে প্রযুক্তি শিখতে লাগলো। প্রযুক্তি হয়ে উঠলো তাদের কাছে বিভীষিকার নাম, আর কোচিং ব্যবসায়ীদের কাছে এটা হলো দারুণ এক সম্ভাবনাময় সুযোগ। এভাবে প্রযুক্তিনির্ভর প্রজন্মের মধ্যেও প্রযুক্তিনির্মাণ-ভীতি যেমন তৈরী করা গেল, তেমনি বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান-গণিত শেখার সময়ও দারুণভাবে কমিয়ে দেওয়া সম্ভব হলো।

 

ছ. বহু গবেষণা করে সৃজন-মনন-শরীর-যোগ্যতা ইত্যাদি বিকাশের কথা বলে শূন্য দশকের শেষের দিকে মাধ্যমিক স্তরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবার জন্য, সকল শাখার জন্য চারুকারু, কর্ম, শরীর, কৃষি ইত্যাদি বিষয় প্রচলন করা হলো। ফল হলো ভাষা, গণিত ও বিজ্ঞানের সময় ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়া হলো। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ভিত শুরুতেই দুর্বল করে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির সুযোগ যেমন কমিয়ে দেওয়া সম্ভব হলো, তেমনি বিজ্ঞান শিক্ষার যেটুকু সম্ভাবনা ছিল, তাকেও ভয়াবহরকমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা গেল।

 

জ. ২০১৫ সালের মধ্যে শতভাগ প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলো। লক্ষ্য অর্জন হলো না, কিন্তু অর্জনের ম্যারাথন করতে গিয়ে প্রশ্নফাঁস, উত্তর বলে দেওয়া, যা খুশী লিখলেই নাম্বার দেওয়া এবং শিশু-শিক্ষক-অভিভাবকদের চূড়ান্তভাবে অনৈতিক-অসৎ হতে অভ্যস্ত করে তোলা হলো। এর মাধ্যমে অনৈতিক হওয়াটাকেই স্বাভাবিক করে তোলা গেল।

 

ঝ. মহান শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণীত হলো। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার কথা বলা হলো। ২০১৮ সালের মধ্যে এটা বাস্তবায়নের তোড়জোড় শুরু হলো। বলা হলো এসএসসি-র আগে কোনো পাবলিক পরীক্ষা নয়। কিন্তু এসএসসি-র আগেই দু-দুটো পাবলিক পরীক্ষার ঘটা শুরু হলো। তার জন্য দুধের বাচ্চাদের নোট-গাইড আর কোচিং-এর বন্যা বয়ে গেল। আর শিক্ষার্থী-অভিভাবক-শিক্ষক সবাই পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পেতে লাগলো, সবাই পাশ করতে লাগলো। কিন্তু অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা আর চালু হলো না। এ নিয়ে এখন আর কোনো কথাও শোনা যায় না!

 

ঞ. বহু গবেষণা করে নব্বই দশকের শুরুতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর চাপ কমাতে এর অধিভুক্ত কলেজগুলোর জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টি করা হলো। ফল হলো সারা দেশের প্রায় সব কলেজই বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ হয়ে গেল, সবাইকে অনার্স-মাষ্টার্স খুলতে দেওয়া হলো। ফলে জেলা পর্যায়ের উচ্চ মাধ্যমিকের সেরা কলেজগুলো ধ্বংস হয়ে গেল, আর এটার মাধ্যমে সারাদেশের সাধারণের সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় ভালো করার সুযোগ ভয়ঙ্কররকমভাবে কমে গেল। আর সেইসব বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজ থেকে লক্ষ-লক্ষ নিম্নমানের উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী বেকার তৈরী হতে লাগলো।

 

ট. বহু গবেষণা করে সেশনজট কাটাতে নব্বই দশকের শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স পদ্ধতি থেকে সেমিষ্টার পদ্ধতি প্রবর্তন করা হলো। ফল হলো বিশ্ববিদ্যালয়েও নোট দেওয়া, সাজেশন দেওয়া, প্রশ্ন দিয়ে দেওয়া, শিক্ষার্থীদের কোনো বই না পড়া, শিক্ষক ও বড়ো ভাইদের নোট ও চোথা পড়ে প্রায় সবার পাশ করে যাওয়া শুরু হলো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও হয়ে উঠলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর আরেক সংস্করণ।

 

 

২.
উপরে শিক্ষামুক্তির যেসব সনদ আমরা দেখলাম, এরকম আরো বহু বহু মুক্তির সনদ এদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নানা সময়ে হাজির করা রয়েছে। বর্তমানে হাজির করা হয়েছে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থার নয়া সনদ। কি আছে সেই সনদে? শুধুমাত্র এসএসসি-র বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেই দেখা যাক।

 

প্রস্তাবিত একমুখী শিক্ষাব্যবস্থায় এসএসসি-তে সবাই একই শাখায় ১০টি বিষয় পড়বে। এই বিষয়গুলো হলো বাংলা, ইংরেজী, গণিত, বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সামাজিক বিজ্ঞান, জীবন ও জীবিকা, ধর্ম, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। অর্থাৎ ভবিষ্যতে বিজ্ঞান পড়ার জন্য কেউ এ পর্যায়ে আর গণিতের পাশাপাশি উচ্চতর গণিত পড়বে না, শুধু সাধারণ গণিত নামের একটা বিষয় পড়বে! অর্থাৎ চাইলেও কেউ আর বাড়তি একটা বিষয় হিসেবে উচ্চতর গণিত নিতে পারবে না। আর এখন শিক্ষার্থীদের নবম শ্রেণীতে গিয়ে শুধু শাখা নয়, কোনো বিষয় পছন্দেরও আর কোনো সুযোগ থাকবে না!

 

প্রস্তাবিত একমুখী শিক্ষাব্যবস্থায় এসএসসি-তে সবাই একই শাখায় ১০টি বিষয় পড়বে। এই বিষয়গুলো হলো বাংলা, ইংরেজী, গণিত, বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সামাজিক বিজ্ঞান, জীবন ও জীবিকা, ধর্ম, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। অর্থাৎ ভবিষ্যতে বিজ্ঞান পড়ার জন্য কেউ এ পর্যায়ে আর গণিতের পাশাপাশি উচ্চতর গণিত পড়বে না, শুধু সাধারণ গণিত নামের একটা বিষয় পড়বে! অর্থাৎ চাইলেও কেউ আর বাড়তি একটা বিষয় হিসেবে উচ্চতর গণিত নিতে পারবে না। আর এখন শিক্ষার্থীদের নবম শ্রেণীতে গিয়ে শুধু শাখা নয়, কোনো বিষয় পছন্দেরও আর কোনো সুযোগ থাকবে না! এক্ষেত্রে ১০টি বিষয়ে সমভাবে নাম্বার বণ্টিত হলে সকল শিক্ষার্থী শুধু বিজ্ঞান নামের একটি বিষয় পড়বে ১০০ নাম্বারের, যা হবে মোট নাম্বারের মাত্র ১০% (যেহেতু উচ্চতর গণিত নামের কোনো বিষয় এখন আর থাকছে না)! উল্লেখ্য গণিত বা সাধারণ গণিত নামের বিষয়টি যেহেতু বিজ্ঞানসহ সকল শাখার শিক্ষার্থীরাই পড়তো, তাই এটাকে বিজ্ঞানের বিষয় হিসাবে আমরা ধরবো না।

 


এর আগে মাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা মোট নাম্বারের কত শতাংশ বিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিত বিষয়ে পড়তে পারতো, তা আমরা একটু দেখে নিতে পারি। 
এখন যে শিক্ষাক্রম চলছে সেখানে ২০১০ সালের পর থেকে এসএসসি-তে বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীরা মোট ১৪টি বিষয়ে ১৩০০ নাম্বারের পড়া পড়ছে। এর মধ্যে বিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিতের নাম্বার ৪০০ (বিজ্ঞান অর্থাৎ পদার্থ-রসায়ন-জীববিজ্ঞান মিলিয়ে ৩০০, উচ্চতর গণিত ১০০), অর্থাৎ মোট নাম্বারের প্রায় ৩১%। উল্লেখ্য এসময়েই আইসিটি, বাংলাদেশ-বিশ্বপরিচয়, কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা, শারীরিক শিক্ষা এই ৪টি বিষয় বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের উপর চাপানো হয় এবং এর মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিতের অংশটুকু ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।

 

এর আগে ২০০০ সালের শিক্ষাক্রম অনুযায়ী বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীরা এসএসসি-তে ১১টি বিষয় পড়তো। তখন মোট ১১০০ নম্বরের মধ্যে বিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিতের নাম্বার ছিল ৪০০ (বিজ্ঞান ৩০০, উচ্চতর গণিত ১০০), অর্থাৎ মোট নাম্বারের ৩৬%। উল্লেখ্য এসময়ে বিষয় হিসাবে সামাজিক বিজ্ঞানও বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, যেটা তারা আগে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ করতো।

 

এরও আগে ১৯৯০ সালের শিক্ষাক্রম অনুযায়ী বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীরা এসএসসি-তে ১০টি বিষয় পড়তো। মোট ১০০০ নাম্বারের মধ্যে বিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিতের নাম্বার ছিল ৩০০ (বিজ্ঞান ২০০, উচ্চতর গণিত ১০০), অর্থাৎ মোট নাম্বারের ৩০%। সাধারণ গণিতের কথা আমরা এই বিবেচনায় নেইনি, সেটা আগে বলেছি।

 

এর আগেও ১৯৮০ সালের শিক্ষাক্রম অনুযায়ী বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীরা এসএসসি-তে ১০টি বিষয় পড়তো। মোট ১০০০ নাম্বারের মধ্যে বিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিতের নাম্বার ছিল ৪০০ (বিজ্ঞান ৩০০, উচ্চতর গণিত ১০০), অর্থাৎ মোট নাম্বারের ৪০%।

 

তাহলে ১৯৮০ সালের পর থেকে বিভিন্ন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী এসএসসির মোট নাম্বারের মধ্যে বিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিতের অংশ যেভাবে কমেছে তা হলো: ৪০% > ৩০% > ৩৬% > ৩১% > ১০%

 

শুধুমাত্র বিজ্ঞানের এই চিত্রটা দেখলেই নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে “পাগলের মনে কি আছে” তা কোনো পাগলেরও না-বুঝতে পারার কোনো কারণ নেই। কিন্তু চারপাশে এসব কথা খুব কমই শোনা যাবে। অধিকাংশ পণ্ডিত এই শিক্ষাক্রমের ধারাবাহিক মূল্যায়ন, আনন্দদায়ক পাঠ, একমুখী শিক্ষা ইত্যাদি সব সুন্দর সুন্দর কথা বলে যাবেন। 

 

৩.
নতুন শিক্ষাক্রমের যেসব সুন্দর দিক নিয়ে পণ্ডিতেরা প্রশংসা করছেন, আমাদের অনেকের কাছেই সেগুলো আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু প্রথমেই আমাদের যেটা মনে রাখতে হবে, ভালোকিছু চালিয়ে দিলেই তা ভালো ফল দিতে শুরু করে—শিক্ষাক্ষেত্রটা এমন নয়। এখানে ভালোকিছু চালানোর উপযোগী ব্যবস্থাপনা হলো ভালো ফল পাওয়ার পূর্বশর্ত। সেই ব্যবস্থাপনা যদি না থাকে, কিংবা পরিকল্পিতভাবে তাকে প্রতিকূল করে রাখা যায়, তবে আগের খারাপ কিছু দিয়ে যতো খারাপ ফল পাওয়া যেতো, পরের ভালো কিছু চালিয়ে দিয়ে তার চেয়ে অধিক খারাপ ফল লাভ করা যায়। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, ঐতিহাসিকভাবে আমাদের শিক্ষাখাতে প্রায় সকল সময়ে এটাই করা হয়েছে, এবং আরো স্পষ্টভাবে বললে, সেটাই চাওয়া হয়েছে। 

 

ধারাবাহিক মূল্যায়নের পাশাপাশি এই শিক্ষাক্রম নিয়ে যেই ঢোলটা বেশি পেটানো হচ্ছে তা হলো, আগে যারা বিজ্ঞান পড়তো না তাদেরও নাইন-টেনে গিয়ে আরো কিছু বিজ্ঞান শেখার সুযোগ ঘটবে। কিন্তু একটুও ভাবা হচ্ছে না, এখনো যে ১৫-২০% শিক্ষার্থী বিজ্ঞান পড়তে চায়, তারা উচ্চমাধ্যমিকে গিয়ে বিজ্ঞান কিভাবে পড়বে, এসএসসিতে উচ্চতর গণিত একটুও না শিখে? কিভাবে এসএসসিতে ফিজিক্স-ক্যামিষ্টি-বায়োলজির একটা সমন্বিত ১০০ নাম্বারের বিজ্ঞান পড়ে তারা উচ্চমাধ্যমিকে ৬শো নাম্বারের বিজ্ঞান পড়বে? আর বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষাই-বা তারা কেমন করে গ্রহণ করবে? 

 

কারণ ব্রিটিশ-আমেরিকান কারিকুলামে চলা এদেশের ইংরেজী মাধ্যমের স্কুল-কলেজগুলোর জন্য এই নতুন শিক্ষাক্রম  নয়। যারা নতুন এই শিক্ষাক্রমের প্রণেতা ও তার গুণগানে মত্ত তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই শিক্ষাক্রমে পড়বে না। তারা এদেশে থেকেই ব্রিটিশ-আমেরিকান শিক্ষাক্রমে পড়বে, কিংবা সরাসরি ইউরোপ-আমেরিকা বা নিদেনপক্ষে দার্জিলিংয়ে চলে যাবে। সেখানে তারা ও-লেভেল বা তার আগে থেকেই ফিজিক্স-ক্যামিষ্ট্রি-ম্যাথ ইত্যাদি বিষয় আন্তর্জাতিক কারিকুলাম অনুসরণ করে পড়তে পারবে, তাদের সমস্যা হবে না।

 

কিন্তু এটা কোনো ব্যাপার না এদেশের শিক্ষা নিয়ে সিদ্ধান্তগ্রহণকারী কর্তাব্যক্তিদের কাছে। কারণ ব্রিটিশ-আমেরিকান কারিকুলামে চলা এদেশের ইংরেজী মাধ্যমের স্কুল-কলেজগুলোর জন্য এই নতুন শিক্ষাক্রম  নয়। যারা নতুন এই শিক্ষাক্রমের প্রণেতা ও তার গুণগানে মত্ত তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই শিক্ষাক্রমে পড়বে না। তারা এদেশে থেকেই ব্রিটিশ-আমেরিকান শিক্ষাক্রমে পড়বে, কিংবা সরাসরি ইউরোপ-আমেরিকা বা নিদেনপক্ষে দার্জিলিংয়ে চলে যাবে। সেখানে তারা ও-লেভেল বা তার আগে থেকেই ফিজিক্স-ক্যামিষ্ট্রি-ম্যাথ ইত্যাদি বিষয় আন্তর্জাতিক কারিকুলাম অনুসরণ করে পড়তে পারবে, তাদের সমস্যা হবে না।

 


তার মানে একমুখী শিক্ষার নামে চালু হতে যাওয়া এই মুক্তির সনদ আসলে আমাদের গরিবের সন্তানদের জন্য প্রযোজ্য, বড়োলোকের জন্য নয়। ওরা বহুকাল ধরে দিনরাত উদয়-অস্ত পরিশ্রম করে, বহুদেশ ঘুরে সিন্ধু-পর্বতমালা দেখে দেখে শিক্ষা-উন্নয়নের নামে যা করে, তা আগেও যেমন করতো অস্বচ্ছল পরিবারের শিশুদের জন্য, এখন এটাও করছে মূলত তাদেরই জন্য। 

 

দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো শিক্ষা-উন্নয়নের নামে ঐতিহাসিকভাবে চলে আসা এই দুর্যোগকে এদেশের রাজনীতি সবসময় উপেক্ষা করে গেছে। মনে রাখা দরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলেপেলেরা পড়ে বটে, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা ছেলেপেলেদের বিষয় নয়। আর একটা ঐতিহাসিক বিষয় আমরা ভুলে যাই যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৃতীয় বিশ্ব নামক সদ্য-স্বাধীনতা পাওয়া নতুন দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থাকে আমেরিকাকেন্দ্রিক বিশ্ব তার উপযোগী করে সাজাতে দেশে দেশে শিক্ষা গবেষণা ইনষ্টিটিউট বা আইইআর-এর মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর-ও পাকিস্তান আমলের শুরুতে তাদেরই টাকা ও পরিকল্পনাতে তৈরি হয়। তাই এখান থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়া সমধর্মী প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রায় একই চরিত্র ধারণ করে। এরা শুরু থেকেই রাষ্ট্রের সহযোগিতায় প্রথমবিশ্ব-পরিকল্পিত শিক্ষাদুর্যোগ কর্মসূচি বাস্তবায়নের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা যেমন নির্মাণ করে, তেমনি সেগুলো বাস্তবায়নের ফলে ঘটা শিক্ষাদুর্যোগের ডায়াগনষ্টিক সাপোর্ট সার্ভিস প্রোভাইডিং ফার্মের মতোও কাজ করে। নানা সময়ে কিছু রেমিডিয়াল মলমের সুপারিশও কমবেশি সেখান থেকে পাওয়া যায় বটে, কিন্তু কখনোই শিক্ষার কোনো ধরণের দুর্যোগে সেখান থেকে খুব একটা উচ্চবাচ্য শোনা যায় না। 

 

এদেশের সকল রাজনীতিকে শিক্ষার এই রাজনীতি গভীরভাবে বুঝতে হবে। নতুবা দেশটা আক্ষরিক অর্থেই হয়ে উঠবে বিশ্বের দেশে-দেশে দাস-শ্রম যোগানো আর তাদের ভোগ্যপণ্য উৎপাদনের ভাগাড়। [জুন ২০২২]
 

রাখাল রাহা
লেখক ও সম্পাদক
আহ্বায়ক, শিক্ষা ও শিশু রক্ষা আন্দোলন (শিশির) 
[email protected]