সোমবার ৯ই আষাঢ় ১৪৩১ Monday 24th June 2024

সোমবার ৯ই আষাঢ় ১৪৩১

Monday 24th June 2024

বহুস্বর মতামত

ইবি শিক্ষার্থীদের গলায় ছাত্রলীগের ধারালো তরবারি

২০২৩-০২-২৬

জি. কে. সাদিক

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো তথা গোটা ক্যাম্পাস একটা সময় মৌলবাদী ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের দখলে ছিল। ২০১৭ সালের ১৪ আগস্টে সেই দখলদারিত্বের উচ্ছেদ ঘটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহায়তায় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে। যে হল-ক্যাম্পাস একটা সময় ছাত্র শিবিরের দখলে ছিল এখন সেই হল-ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ছাত্রলীগের একক দখলদারিত্ব চলছে। দখলদারের পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু শিক্ষার্থীরা মুক্তি পায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে ৮টি আবাসিক হল (৫টি ছাত্র ও ৩টি ছাত্রী) রয়েছে। হলগুলোয় প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থীর আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। সেই ২০১৭ সালের ১৪ আগস্ট থেকে এই ৫ হাজার আবাসিক শিক্ষার্থী পুরো শিক্ষাজীবন এখন ছাত্রলীগের মর্জির উপরে নির্ভর করছে। কে হলে থাকতে পারবে বা কে ক্যাম্পাসে অবস্থান করে শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারবে সেটা পুরোপুরি ছাত্রলীগের চাওয়া না চাওয়ার উপরে নির্ভর করছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কোনো কাঠামোর অস্তিত্ব আছে এবং তারা শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো কাজ করছে এই বোধ এখন আর ইবি শিক্ষার্থীদের মাঝে নেই। ক্যাম্পাস এখন ছাত্রলীগই বাপ, তারাই মা।

 

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশরত্ন শেখ হাসিনা হলে হলে একজন নারী শিক্ষার্থীকে বিবস্ত্র করে নিপীড়নের যে ঘটনা এখন টক অব দ্য কান্ট্রি, সেটা ২০১৭ সাল থেকে চলা শিক্ষার্থী নিপীড়নের একটা ঘটনা মাত্র। এরকম ভয়াবহভাবে শিক্ষার্থী নিপীড়নের ঘটনা নিত্যই ইবিতে ঘটছে, যেগুলো প্রকাশ্যে না আসার ফলে আমরা তার কোনো খবর পাই না। গত কয়েক মাসের মধ্যেই ইবিতে শিক্ষার্থী নিপীড়ের বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। এর মাঝে গত বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের আহ্বায়ক পপি আক্তার নামে এক শিক্ষার্থীকে দিনের বেলায় ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে মারধোর করেন শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জয়ের ডান হাত খ্যাত ছাত্রলীগ নেতা মেহেদী হাসান হাফিজ। সেই ঘটনায় সেদিন রাতেই খালেদা জিয়া হলের নারী শিক্ষার্থীরা রাতভর আন্দোলন করে।

 

 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যবস্থা না নেওয়ার অবশ্য কিছু কারণ রয়েছে। যেমন: ২০১৮ সালে যখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি এক লাফে তিন গুণ বৃদ্ধি করা হলো তখন শিক্ষার্থীরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই আন্দোলন দমন করে ছাত্রলীগের সহযোগিতায়। এই দাবিতে যখন ২০১৯ সালে আবারও আন্দোলন শুরু হয় তখন আন্দোলনকারীদের রুমে ডেকে নিয়ে হুমকি দেয়াসহ নানা পদ্ধতিতে দমন করার কাজটি করে ছাত্রলীগ নেতারা।

 

 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই ঘটনায় তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দিলেও এখনো পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং যে নারী শিক্ষার্থীরা রাতে হলে আন্দোলন করেছে, ছবি দেখে দেখে ছাত্রলীগ তাদেরকে হুমকি দিয়ে আন্দোলন বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি যে নারী শিক্ষার্থী মারধোরের শিকার হয়েছেন তাকেই হুমকি দেয়া এবং ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয়ার ভয় দেখিয়ে তার বিরুদ্ধে পাল্টা আন্দোলন করে পুরো ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। এটা যে প্রশাসনের অজ্ঞাতে করা হয়েছে বিষয়টি এমন না। খোদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জ্ঞাতেই ছাত্রলীগ এই কাজটি করেছে। যার ফলে পাল্টা হুমকির ভয়ে মেয়ে হলগুলোতে যেকোনো নারী নিপীড়নের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। এমনকি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা যেসব নারী উত্যক্তের মতো ঘটনা ঘটায় সেটাও বেশি প্রকাশ হয় না। আসলেও সেটা প্রশাসনের আয়োজিত গোল টেবিল বৈঠকেই সমাধান করে নেয় ছাত্রলীগ। প্রশাসন এখানে নিপীড়িতের সুবিচার নিশ্চিতের চেয়ে ছাত্রলীগের দায়মুক্তির কাজটিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে।

 

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী নিপীড়নের সবচেয়ে কমন একটি রীতি হচ্ছে, কাউকে ব্যক্তিগত জেদ বা শত্রুতা থেকে মারার পর তাকে শিবির বা ছাত্রদল ট্যাগ দিয়ে সেটাকে বৈধ করা। বিশেষ করে ২০১৭ সালের এপ্রিলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের যে কমিটি করা হয়েছিল সেটির পর থেকেই ইবিতে একদিকে ব্যক্তিগত জেদ, শত্রুতার জন্য যেমন শিবির ট্যাগ দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী নিপীড়নের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে, একইসাথে শিক্ষার্থীদের যে কোনো ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন দমনের ক্ষেত্রেই শিবির-ছাত্রদল ট্যাগটি ব্যাপক হারে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এই কাজটি করা হতো এবং এখনো করা হয় আবাসিক হলগুলোতে ছাত্রলীগের যে টর্চার সেলগুলো রয়েছে সেখানে নিয়ে।

 

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী নিপীড়নের চিত্র কতটা ভয়ংকর তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারির ঘটনার পর ছাত্রলীগের টর্চার সেলে নিপীড়নের শিকার কয়েকজন শিক্ষার্থীর বক্তব্য তুলে ধরে সম্প্রতি দেশ টিভি একটি প্রতিবেদন করেছে। এর আগে ২০১৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বরে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় ‘ইবির হলে ছাত্রলীগের টর্চার সেল’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যে প্রতিবেদনে ইবির ৫টি ছাত্র হলে ছাত্রলীগের টর্চার সেলে শিক্ষার্থী নিপীড়নের ভয়াবহ চিত্র প্রকাশিত হয়। ২০১৯ সালের ২০ অক্টোবরে দৈনিক সমকাল পত্রিকায় ‘ইবিতে কথার বাইরে গেলেই নির্যাতন’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। দুটি প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন হলে কত নম্বর রুমে শিক্ষার্থী নিপীড়নের ঘটনা ঘটে এবং নিপীড়নের বিভৎস চিত্রও প্রকাশিত হয়। পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন ঘটনার মাঝে একটি ঘটনার বিবরণ এমন, ‘বিভিন্ন ঘটনার সাক্ষী আইন অনুষদের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘আমরা প্রথমে ক্যাম্পাসে আসার পর আইন বিভাগের ইমিডিয়েট সিনিয়ররা প্রায়ই ডাকতেন। প্রথমে আমাদের বঙ্গবন্ধু হলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমাদের লাঠি, হকিস্টিক, ছুরি দেখানো হয়। বলা হয় তাদের কথার বাইরে না যেতে। এরপর একদিন সাদ্দাম হোসেন হলের সামনে আমাদের এক বন্ধুকে শিবির সন্দেহে মারধর করে তারা। ওর ম্যাসেঞ্জার চেক করে। কিছু পায় না। এরপর ওকে বঙ্গবন্ধু হলের ৪১৯ নম্বর রুমে নিয়ে গিয়ে লাঠি, হকিস্টিক দিয়ে অনেক মারে। ও স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছিল না। এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবাদ করার কোনো সুযোগ ছিল না।’ (সমকাল: ২০ অক্টোবর ২০১৯)

 

দৈনিক যুগান্তর ও সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর (ছাত্র) বেশ কিছু কক্ষের নামও উঠে আসে। যেমন: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের আন্তর্জাতিক ব্লকের ২১৩ নম্বর কক্ষ, একই হলের জাতীয় ব্লকের ৪১৯ নম্বর কক্ষ (এই কক্ষটি ডেঞ্জার রুম নামে পরিচিত), শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ২০৮ ও ২২৬ নম্বর কক্ষ অন্যতম। এর বাইরে সাদ্দাম হোসেন হলের দুইটি কক্ষ, লালন শাহ হলের বেশ কিছু কক্ষ ২০১৭ সাল থেকে ছাত্রলীগের টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। এসব কক্ষের কথা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থী সবাই জানে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেমন কিছুই করছে না তেমনি ঘাড়ে দু’টি মাথা না থাকায় কোনো সাধারণ শিক্ষার্থীও এসব বিষয়ে মুখ খুলে না। পরিস্থিতি এমন যে, ক্যাম্পাসটির ১৮ হাজার শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের কাছে জীবন জিম্মা রাখার বদৌলতে ইবিতে পড়াশোনা করছে।

 

ছাত্রলীগের এসব টর্চার সেলে কী ধরনের নিপীড়নের ঘটনা ঘটে তার কিছু চিত্র রিপোর্ট দুটিতে উঠে এসেছে। যেমন, কাউকে শিবির বলে সন্দেহ করে তাকে ডেকে নিয়ে বা বাইকে করে তুলে নিয়ে কক্ষে আটকে লোহার রড, হকিস্টিক, লাঠি, স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়ে প্রথমে শিবির বলে স্বীকারোক্তি নেয়া হয়। তারপর তাকে পুলিশে না দেয়ার শর্তে তাদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না দিতে পারলে তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহায়তায় পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এর বাইরে যারা শিবির বলে স্বীকৃতি দেয় না,  তাদের উপর চলে টানা নিপীড়ন। এসব ঘটনা ক্যাম্পাসে সবার জানা। খোদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এসব ঘটনা জানে, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয় না।

 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যবস্থা না নেওয়ার অবশ্য কিছু কারণ রয়েছে। যেমন: ২০১৮ সালে যখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি এক লাফে তিন গুণ বৃদ্ধি করা হলো তখন শিক্ষার্থীরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই আন্দোলন দমন করে ছাত্রলীগের সহযোগিতায়। এই দাবিতে যখন ২০১৯ সালে আবারও আন্দোলন শুরু হয় তখন আন্দোলনকারীদের রুমে ডেকে নিয়ে হুমকি দেয়াসহ নানা পদ্ধতিতে দমন করার কাজটি করে ছাত্রলীগ নেতারা। তখন সেই আন্দোলনকারীদের অন্যতম ছিল এই লেখক নিজেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের অফিস থেকে ডেকে এনে সবার সামনে হুমকি দেয়া হয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সরাসরি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনের কাজ করেছে। এবং এই আন্দোলনে যে শিক্ষার্থীরা সামনে থেকে কাজ করেছে তাদেরকে শিবির-ছাত্রদল ট্যাগ দিয়ে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে।

 

বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ইবি ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা কাউকে ধরে শিবির বা ছাত্রদল বলে পিটিয়ে পরে বিজিয় মিছিল করে শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে বাহবা নিয়ে থাকে। তবে শিবির ট্যাগ দিয়ে যাদেরকে মারা হয় তাদের অধিকাংশই সাধারণ শিক্ষার্থী। ঘটনার পর খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে সেই শিক্ষার্থীর সাথে ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে বা কেবলই সন্দেহের বশে তাকে পিটিয়ে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে একজন শিক্ষার্থীকে শিবির বলে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে ছাত্রলীগ কর্মীরা। পরে ইবি থানার এসবি প্রতিবেদনে বলা হয় সেই শিক্ষার্থী শিবিরের সাথে সম্পৃক্ত না। গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বরে দুই জন শিক্ষার্থীকে শিবির বলে মারধোর করা হয়। মারধোরের শিকার সেই শিক্ষার্থীরা কেউই শিবিরের রাজনীতির সাথে জড়িত না। নিছক সন্দেহের বশে তাদেরকে নিপীড়ন করা হয়। মারধোরের শিকার জামাল নামে একজন শিক্ষার্থী আক্ষেপ করে সংবাদমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে বলেছেন, ‘দেড়টা পর্যন্ত আমার ক্লাস ছিল। ক্লাস শেষ করে মেসে যাচ্ছিলাম। সাদ্দাম হলের সামনে গেলে কয়েকজন আমাকে নাম-বিভাগসহ বিভিন্ন কথা জিজ্ঞেস করে। পরে অনুষদ ভবনের দিকে নিয়ে যায়। সেখানে যাওয়ার পর আরও কয়েকজন মিলে জিজ্ঞাসাবাদ করে। শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা জানতে চায়। কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বললেও আমার সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেন। একপর্যায়ে দৌঁড়াতে বললে আমি ভয়ে দৌঁড়ে চলে যাই। কোনো প্রকার সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও একটা সংগঠনের তকমা দিয়ে যেভাবে হেনস্তা করা হলো, আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।’ (ইবিতে শিবির সন্দেহে দুই শিক্ষার্থীকে পেটাল ছাত্রলীগ। ঢাকা পোস্ট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২)

 

ঘটনার শুরুটা হচ্ছে, সেদিন ছাত্রলীগের অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী অনুষদ ভবনের সকল শ্রেণিকক্ষে গিয়ে লাথি মারতে থাকে এবং শিবির সন্দেহভাজন শিক্ষার্থীকে খুঁজতে থাকে। কাউকে না পেয়ে অনুষদ ভবন ত্যাগ করে। এরপর ক্যাম্পাসসহ প্রশাসনিক ভবন শোডাউন দেন। পরে জঙ্গিবিরোধী নানা স্লোগান দিয়ে ক্যাম্পাসে মিছিল বের করে ছাত্রলীগের কর্মীরা। মিছিল শেষ করে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল এলাকার জিয়া মোড়ে অবস্থান করছিল তখন জামাল নামের ওই শিক্ষার্থীর উপরে তাদের নজর পরে। এমন অনেক শিক্ষার্থীই ছাত্রলীগের নজরে নিয়মিতভাবে পরছে। ক্যাম্পাসে পড়াশোনার শেষ দিকে এসে ছাত্রলীগের নজরের শিকার এক শিক্ষার্থী আফসোস করে তার ফেইসবুকে লেখেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষে এসে মার খেয়ে ক্যাম্পাস ছাড়তে হচ্ছে’। (ঢাকা পোস্ট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩)

 

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সকল শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা করেন তারাও যে সব ঘটনা নিয়েই লিখতে পারছেন বিষয়টি এমন না। এমন অনেক ঘটনাই থাকে যা নিয়ে ভুক্তভোগী কথা না বলায় বা পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ায় তারা লেখতে পারছে না। এসব কিছুর পরও যারা তথ্য সংগ্রহ করে লিখেছেন, তাদেরকেও উন্মুক্ত রামদা হাতে মারতে যাওয়া হচ্ছে। গত বছরের ১৯ জুলাই রাতে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়কে একটি ট্রাকে ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত দুই ছাত্রলীগ কর্মীর খবর প্রকাশ করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওই দুই ছাত্রলীগ কর্মীর মধ্যে একজন রাম দা হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসিতে সাংবাদিকদের প্রেস কর্নারে হামলা চালায়। এর আগে আবাসিক হলে এক সাংবাদিকের রুমেও আক্রমণ হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকদের মোবাইল ফোন, ক্যামেরা কেড়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটছে। (ইবিতে সাংবাদিক মারতে অস্ত্র হাতে মহড়া ছাত্রলীগ কর্মীর। দেশ রূপান্তর: ২০ জুলাই ২০২২)

 

ইবির পরিস্থিতি এমনই। পরিস্থিতি কতটা নাজুক তার আরেকটা দৃষ্টা হচ্ছে, সম্প্রতি ইবিতে নারী শিক্ষার্থীকে বিবস্ত্র করে নিপীড়নের ঘটনায় সারাদেশে তোলপাড় হলেও ইবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা এমনকি নিপীড়নের শিকার সেই শিক্ষার্থীর বিভাগের বন্ধু-সহপাঠী বা সিনিয়র কেউই কিছু বলতে সাহস করছেন না। কেউই টেলিভিশনের সামনে বা মিডিয়াকে কিছু বলছেন না। এমনকি ইবির শিক্ষকরা পর্যন্ত চুপ করে আছেন। যে কয়েকজন শিক্ষার্থী এই ঘটনায় মিডিয়াতে কথা বলেছে, তাদের সংখ্যা হাতে গুনে ৪-৫ জন। তারাই ঘুরে-ফিরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কথা বলছে। এদের প্রায় সব কয়জনই বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের কর্মী। যারা ক্যাম্পাসে কোনো রকমে প্রাণ ওষ্ঠাগত অবস্থায় নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। মিডিয়াগুলো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কোনো শিক্ষার্থীকে মিডিয়ার সামনে বক্তব্য দেয়ার জন্য রাজি করাতে পারেনি। কারণ, যে বা যারাই কথা বলছে তাকে বা তাদেরকেই ধরে হুমকি দেয়া হচ্ছে। এমনকি ছাত্রলীগ এই ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগও করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে। অবস্থান যখন বেগতিক দেখেছে তখন তারা কিছুটা পিছিয়ে এসেছে।

 

ইবির ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর গলায় ছাত্রলীগের এমন ধারালো তরবারি নিয়েই নিত্য পাঠগ্রহণ করছে। প্রাণটা বিনাশর্তে বন্ধক দিয়ে নিত্যই যেখানে বিদ্যাচর্চার ভড়ংবাজি হচ্ছে। প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থী নিপীড়নের এসব ঘটনা প্রকাশ হচ্ছে না। খবর প্রকাশ হলেও প্রান্তিক জনপদের একটি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় ইবির এসব খবর জাতীয় পর্যায়ে তেমন একটা গুরুত্বও পাচ্ছে না।

 

 

জি. কে. সাদিক

সাংবাদিক ও সাবেক শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ই-মেইল: sadikiu099@gmail.com

Your Comment