সোমবার ১৯শে আষাঢ় ১৪২৯ Monday 4th July 2022

সোমবার ১৯শে আষাঢ় ১৪২৯

Monday 4th July 2022

প্রচ্ছদ সম্পাদকীয়

চুবানোর সংস্কৃতি ও চুপচাপ গণমাধ্যম

২০২২-০৫-২১

সম্পাদকীয়

     

কার্টুন: তীর্থ

 

 

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পদ্মা সেতু থেকে ‘টুস করে ফেলে দেয়ার’ এবং ড.  মুহাম্মদ ইউনূসকে না মেরে ‘দুই চুবানি’ দিয়ে তুলে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন দেশের সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। তার এই ধরনের মন্তব্যের অভ্যাসের সাথে আগে থেকে যারা পরিচিত, তারা বিস্মিত হননি। হা হুতাশও করেননি। গণমাধ্যম তেমন কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখায়নি। উনি এভাবেই বলে থাকেন, এমন মনোভাবেও অনেককে দায় এড়াতে দেখেছি। আসলেই কি এভাবে নিজেদের বুঝ দেয়া যায়? 

 


যতদূর মনে পড়ে, দশককাল আগেও একটা সময় ছিল যখন এ ধরনের মন্তব্য নিয়ে গণমাধ্যমে অন্তত সম্পাদকীয় স্তম্ভ আকারে কিছু মন্তব্য আসত, কথাবার্তা হতো। ক্ষমতাবানদের ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ বাংলাদেশে প্রায়শই এমনটা হয়ে থাকে যা অমার্জিত শুধু নয়, সেগুলোর পেছনে আছে অনিয়ন্ত্রিত স্বেচ্ছাচারিতা, কখনো কখনো মনে হয় সেগুলো মানসিক কোনো অবস্থার প্রতিফলন। এই তিক্ত বাস্তবতার পরও সেগুলো নিয়ে যখন বাদ-প্রতিবাদ হয়, আলোচনা হয়, প্রতিবাদ আসে, এবং সেগুলো গণমাধ্যমে স্থান পায়, সেটার একটা সামষ্টিক চাপও ক্ষমতার ওপর পড়ে। সাম্প্রতিক বিপরীত বাস্তবতা হলো প্রধানতম পদগুলোতে থাকা ব্যক্তিদের এই ধরনের বক্তব্য নিয়ে আজকাল কেউ কথা বলবার সাহসও করেন না।

 


ব্যক্তিগতভাবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে বলে দ্য ডেইলি স্টার- এর সম্পাদক মাহফুজ আনাম একটা অত্যন্ত ‘বিনয়ী’ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেখানে তিনি জানিয়েছেন তার বিষয়ে করা মন্তব্য তথ্যভিত্তিক নয়। সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে তিনি বলেন: “এ ধরনের উদ্দেশ্য নিয়ে কখনো যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাইনি, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাইনি, কখনো হিলারি ক্লিনটনকে কোনো ই-মেইল পাঠাইনি, ওয়াশিংটনে বা বিশ্বের অন্য কোনো জায়গায় বা শহরে পদ্মা সেতুর অর্থায়নের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত কোনো বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কোনো ধরনের বৈঠক বা যোগাযোগ করিনি।”

 

 

এইটুকুই। সবগুলো পত্রিকাই চুবানো এবং টুপ করে ফেলে দেয়ার আগ্রহের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে। সম্পাদক মাহফুজ আনাম তার বিষয়ে অভিযোগ সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে জবাব দিয়েছেন। কিন্তু দেশের প্রধান নির্বাহী পদে দায়িত্বরত ব্যক্তিটি যে দেশের নাগরিকদের নিয়ে এমন তাচ্ছিল্যপূর্ণ সহিংস মন্তব্য প্রকাশ্য আলোচনা সভায় করলেন, সেই বিষয়ে গণমাধ্যম যতদূর সম্ভব নীরব। 

 

 

বলে রাখি, মাহফুজ আনামের বক্তব্যের ওপর ব্যক্তিগতভাবে আমার আস্থা আছে, তিনি এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ আমি দেখি না। এবং তিনি যখন বিবৃতি দিয়েই বলেছেন যে এমন কোনো তৎপরতায় তিনি জড়িত নন, তখন অভিযোগকারীদেরই ওপর দায়িত্ব বর্তায়: হয় তা প্রমাণ করার কিংবা ভুল অভিযোগের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার। কিন্তু ওই বক্তৃতায় যেভাবে বলা হলো “যেটা আমরা শুনেছি—মাহফুজ আনাম”– তাতে বোঝা যায় এই জাতীয় শোনা কথার ওপরই এই রাষ্ট্র চলে, তার ওপর ভিত্তি করেই বিষোদগার, এবং শারীরিক শাস্তি দেয়ার বাসনা প্রকাশ করা হয়, এবং কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর, নিহত লেখক মুশতাক আহমেদ, সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল, সাংবাদিক রোজিনা ইসলামসহ আরও অজস্র ঘটনায় আমরা জানি যে এগুলো নিছকই কথার কথা নয়। সেই বাসনা চরিতার্থ করার রাষ্ট্রীয় সকল আয়োজনও এখানে ভালোমতোই মজুদ আছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম এই বাস্তবতায় বাস করে।

 

দ্য ডেইলি স্টারপ্রথম আলোর বাস্তবতা কিছুটা তাই অনুমেয়। পদ্মাসেতু করতে না দেয়ার প্রচারণায় তাদের নাম যেভাবে নানান সময়ে যুক্ত করা হয়েছে তাতে এই প্রসঙ্গে কথা বলাটা তাদের জন্য সমস্যার। অথচ পদ্মাসেতু বিষয়ে এই দুটি পত্রিকাই ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক খবরই প্রকাশ করে আসছে প্রথম থেকে। বরং বাংলাদেশে গত দুই মেয়াদে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে যথেষ্ট লঘু স্বরেই কিছু ভিন্নমতকে জায়গা করে দেয়ার কারণে বহুভাবেই এই দুটি পত্রিকা সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে। ‘আমার দেশ’ এবং সমমতালম্বী কয়েকটি গণমাধ্যমের মত প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক দমনের শিকার হওয়া এড়াতে তারা একটা কৌশলী অবস্থান ও নানান রকম ভারসাম্যনীতি নিয়ে তাদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আর্থিক দিক দিয়ে তাদেরকে অনেকটাই শায়েস্তা করা হয়েছে। ফলে দুর্নীতি ইত্যাদি নানান প্রসঙ্গে পেশাদারিত্বের সাথে প্রতিবেদন নিয়মিতভাবেই করলেও তারা সকল উপায়ে চেষ্টা করে চলেন আর কোনো ‘প্রতিহিংসা’ যেন তাদের ওপর নেমে না আসে। তাই রাজনৈতিক প্রসঙ্গগুলোতে তারা সরকারকে যথাসম্ভব না ক্ষেপাবার এবং ব্যক্তিগতভাবে প্রধানতম ব্যক্তিদের সমালোচনা সর্বতোভাবে এড়িয়ে যায়। 

 


কিন্তু অন্য পত্রিকাগুলো? অন্তত আমার চোখে পড়েনি এই রকম একটা বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা। যতদূর সম্ভব খুঁজেছি অনলাইনে, ছাপা পত্রিকাতে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে বাংলাদেশে এখন গণমাধ্যমে কোনো রকম হৈচৈ না তুলে অনায়াসে এমন কথা বলে ফেলা যায়। কেননা এই জাতীয় কথাবার্তা বেআইনী, উস্কানি ছড়ায় কিংবা অসৌজন্যমূলক হিসেবে কোনো গণমাধ্যম ধরিয়ে দেবে না। এটাই গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের বাস্তবতা। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনগুলোতে যে ধরনের মোসাহেব পরিবৃত্ত সাংবাদিকতা আমরা দেখেছি, তারই পরিপূরক দিকটি হলো সম্পাদকীয় স্তম্ভগুলোতে নীরবতা, চুবিয়ে শিক্ষা দেয়ার মত এমন ভয়াবহ একটা প্রসঙ্গ। এটা লেখকদের দোষ নয়, স্পষ্টতই সম্পাদকদেরই অনুসৃত নীতি। পত্রিকাগুলো অন্তত মৃদু স্বরে বলতে পারতো যে একটা দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকা কেউ যখন এমন বক্তব্য দেন, সেটা তার অনুসারীদের কাছে একটা সহিংস বার্তাও ছড়ায়। বাংলাদেশের মত একব্যক্তি কেন্দ্রিক রাষ্ট্রে এটা এমনকি পুলিশ ও প্রশাসনের কাছেও অনুসরণীয় নীতি হিসেবে বিবেচিত হবে। হেলমেট বাহিনী থেকে শুরু করে ক্রসফায়ার-গুম, এগুলোর রমরমার সাথে এই চুবানি দেয়ার খায়েসের প্রত্যক্ষ সম্পর্কই আছে।

 

 

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে নিউ এজ একটি অনন্য কার্টুন ছেপেছে, মেহেদী এঁকেছেন সেটি। এছাড়া দৃকনিউজে সেদিনই গিয়েছে তীর্থর একটি কার্টুন। এছাড়া অনলাইনে ছড়িয়েছে অপুর আরেকটি কার্টুন। কিন্তু সাধারণভাবে বাংলাদেশ থেকে তো কার্টুন নির্বাসিত। ফলে অধিকাংশ বাংলা পত্রিকাই এই রকম একটা আদর্শ ‘কার্টুনীয়’ বিষয়েও কোনো কার্টুন করতে সাহস করেনি। কার্টুনিস্ট কিশোরের পরিণাম সকলেরই স্মরণে আছে। সেটা যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছে, তাতে এই বিষয়গুলোতে দুই দশক আগেও নিশ্চিতভাবেই যে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুনগুলো আমরা দেখতাম, তার অনুপস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে পড়েছে।

 

 

দৈনিক নিউ এজে প্রকাশিত কার্টুন। কার্টুনিস্ট: মেহেদী

 

 

দুই.

বাংলাদেশে এখন তাহলে বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে এই যে কয়েকজন ব্যক্তি যাই বলুক, তার প্রতিবাদ করা যাবে না। কয়েকটি ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ আছে, যা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা-পর্যালোচনা করা যাবে না। পদ্মা সেতু এগুলোর মাঝে ‘অতি পবিত্র’ প্রসঙ্গে পরিণত হয়েছে, যেটা নিয়ে কেউই কথা বলেন না। কিন্তু পদ্মা সেতু নিয়েও বহু রকম আলোচনা, তর্ক, বিকল্প ভাবনা সমাজে হওয়াটা দরকার ছিল। সেগুলোর মীমাংসার শেষেই একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এত বিরাট আকারের একটা প্রকল্প নেয়া হয়।

 


পদ্মা সেতু নিয়েই আলোচনা হোক। নিচের কোনো একটা বা একাধিক প্রশ্ন যদি কেউ উত্থাপন করেন, তাহলে তাকে কি পানিতে ফেলে দেয়ার, কিংবা চুবানোর প্রস্তাব করাটা ন্যায্য হবে? বা তাকে পদ্মা সেতুতে উঠতে না দেয়ার কথা বলা যাবে, রীতিমত আলোচনা সভার আয়োজন করে? উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর কোন কোনটা ভুল হতে পারে, কিংবা সবগুলোই ভুল হতে পারে। কিন্তু সুস্থ হয়ে ভেবে দেখুন তো, সবগুলোই কি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার দাবি রাখে না? যতদূর বুঝি, পৃথিবীর যে কোনো সুস্থ দেশে এইসব আলোচনাকে গণমাধ্যমে অনেক বেশি বেশি করে সামনে আনা হতো। নানান সময়ে গণমাধ্যমে পদ্মা সেতু নিয়ে যে ‘ইতিবাচক’ আলোচনাগুলোই দেখেছি, তার সূত্রেই নানান মহল থেকে এই প্রশ্নগুলো আসতে পারতো, এমনকি প্রশ্নগুলোর কোন কোনটি পরস্পর বিরোধীও:

 


১. পদ্মা সেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু পদ্মা সেতুর নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিক বেশি। এই সেতুর খরচ দিয়ে হয়তো তিনটা একই রকম সেতু নির্মাণ সম্ভব ছিল। ফলে পদ্মা সেতুর ব্যয় নিয়ে ভবিষ্যতে একটা তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয় ও দুর্নীতি প্রমাণিত হলে, দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

 


২. পদ্মা সেতু নির্মাণ সঠিক হলেও তা আদৌ অগ্রাধিকারে আসা উচিত হয়নি। ৩০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে উন্নত হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় কৃষির উপযোগী কৃষিজ দ্রব্যাদি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি ছিল, যেন ওই মানুষদের ঢাকার মুখাপেক্ষী না থাকতে হয়। এই অর্থই যথেষ্ট ছিল দক্ষিণাঞ্চলে তেমন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য। নিশ্চিত করা দরকার ছিল যেন সবগুলো বিভাগে উন্নততম চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়। পদ্মা সেতুর কারণে যে পরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরি হবে, তার চাইতে অনেক বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হতো এই ধরনের কার্যকর স্থানীয় অর্থনীতি বিকশিত করার উদ্যোগগুলোতে। 

 


৩. পদ্মা সেতুর অনিয়ন্ত্রিত ব্যয়ের কারণে ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলগুলোতে না শুধু, দেশব্যাপী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ জনকল্যাণমূলক খাতে বিনিয়োগ বহু বছরের জন্য কমে যেতে পারে, যখন ঋণ শোধের চাপ তৈরি হবে। সেতুর ওপর দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা আশা অনুযায়ী না হলে এই চাপ আরও বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে।

 


৪. পদ্মা সেতুর প্রয়োজন আছে। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় কাজটি সম্পাদন করা হয়েছে, তাতে গুরুতর প্রক্রিয়াগত গাফিলতি হয়েছে। নকশায় বড় ধরনের ত্রুটি ছিল। এই কারণে স্প্যান বসাতে জটিলতা হয়। পলি ও কাদা মাটির স্তর নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, সেটা এত বড় একটা প্রকল্পে অদৃষ্টপূর্ব। যথাযথ ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা না করার কারণে এটা ঘটেছে। এর কারণে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকল্প প্রণয়ন ও নির্মাণকারীরা এক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিয়ম কিংবা অবহেলা করেছেন। এর ভবিষ্যৎ ফলাফল আমরা জানি না।

 


৫. পদ্মা সেতু নির্মাণ করা উচিত ছিল রাষ্ট্রের একটা নির্দিষ্ট প্রস্তুতির পরই। পদ্মা সেতুর পরিকল্পনা প্রণয়ন, নকশা ও নির্মাণে দেশীয় প্রকৌশলীদের ভূমিকা কতটুকু? এত বড় একটা প্রকল্প নির্মাণ শেষে দেশে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি কতটুকু তৈরি হয়েছে, এবং না হলে কেন হয়নি, সেটা নিয়ে আলোচনা করা দরকার। যমুনা সেতুর পর পদ্মা সেতুতেও যদি বিদেশী প্রযুক্তি ও লোকবল ভরসা হয়, সেটা অগ্রগতির নিদর্শন নয়। এমন একটা প্রকল্প থেকে প্রকৌশলগত জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়া উচিত।

 


৬. পদ্মা সেতু আদৌ করা উচিত হয়নি। পদ্মা পৃথিবীর সব চাইতে অস্থির নদীগুলোর একটা। প্রকৃতিগতভাবে গত হাজার বছরে এর প্রধান স্রোত বহুবার বদলেছে, তেমন উদাহরণ আমরা ইতিহাস ও সাহিত্যে পাই। এই নদী এখনও স্থির হয়েছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সামনের দিনে হিমালয়ের পানি আরও বেশি করে গলতে থাকলে, বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেলে পানি ও পলি উভয়ের পরিমাণই বৃদ্ধি পেতে পারে, যাতে পদ্মা সেতুকে রক্ষা করার জন্য নদী শাসনের খরচ ক্রমশ বাড়তে থাকবে। নরম পলি মাটির ভূমি ক্ষয়ের কারণে ভবিষ্যতে পদ্মাকে সেতুর নিচে ধরে রাখার ব্যয় কী হারে বাড়বে, তা কি আমরা জানি? সম্ভাব্য এই ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের পরও কি সেতু লাভজনক থাকবে?

 


৭. পদ্মা সেতু নির্মাণ করা উচিত ছিল পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই করে, কাজগুলোতে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের পূর্ণরূপে সম্পর্কিত করে, এবং আরও বেশি প্রকাশ্যে, আরও বেশি আলোচনার ভিত্তিতে। কেননা বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই প্রকল্পের স্বার্থেই সমীক্ষার ইতিবাচক ফল দিয়ে থাকে। যেমন শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের প্রতীক হাম্বানটোটা সমুদ্র বন্দরের সমীক্ষা করেছিল প্রথমে একটি কানাডীয় প্রতিষ্ঠান, পরবর্তীতে একটি ডেনিশ প্রতিষ্ঠান। দুটো প্রতিষ্ঠানই বন্দরের পরিকল্পনাকে লাভজনক বলেছিল, অথচ নির্মিত হবার পর এই বন্দরে প্রায় কোনো জাহাজ ভেড়ে না। ধরে নেয়া যায় যে পদ্মা সেতুতে অনেক বেশি গাড়ি চলবে। কিন্তু তাতে নৌপথের অবনতি ঘটতে পারে, যেটা হয়তো অনেক ভালো বিকল্প ছিল বাংলাদেশের জন্য। এর চাইতে বড় আশঙ্কা হলো বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি নিয়ে বিদেশীদের অভিজ্ঞতা ও যথাযথ জ্ঞানের ঘাটতির সম্ভাবনা। 

 


৮. পদ্মা সেতু বাংলাদেশের ধারাবাহিক অবকাঠামোগত ‘উন্নয়নের’ ফল। খালেদা জিয়ার বিগত আমলে পদ্মা সেতু বিষয়ে ২০০৫ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও সম্পন্ন হয়েছিল। সেটি করেছিল জাইকা। আরিচা ও মাওয়া এই দুটি স্থানকে নির্বাচন করা হয়েছিল। রাজনৈতিকভাবে স্থান বাছাই নিয়ে দুই অঞ্চলের তীব্র বিবাদের পর মাওয়াকেই বিএনপি প্রাধান্য দিয়েছিল। এটা বাংলাদেশে উন্নয়নের রাজনীতি চলছে, তার পরম্পরা। কেউ কেউ এটাকে উন্নয়ন বলে মনে করেন, কেউ কেউ মনে করেন যে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ বিষয়ে উদাসীন অদূরদর্শী অবিবেচনাপ্রসূত অর্থনৈতিক চিন্তা।

 

 

উপরে বলা প্রতিটা কথা ভুল হতে পারে। হয়তো কোনো কোনটিতে সামান্য কিছু সারবত্তা থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু এইসব আলাপ ২০১৪’র পর থেকে প্রায়ই অনুপস্থিত। পদ্মা সেতুর ইআইএ রিপোর্ট বা অর্থনৈতিক সমীক্ষাগুলো নিয়েও যথেষ্ট আলোচনা গণমাধ্যমে দেখা যাবে না। কেননা বহুদিন ধরেই এই প্রকল্প একটা জনপ্রিয় রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বোধগম্য যে, ফেরি পারাপারের রাস্তার দুরবস্থা, অনিয়ম, গাফিলতি এবং অযথা সময় ক্ষেপন দক্ষিণাঞ্চলীয় জনসাধারণকে প্রতিদিন যে তিক্ত বাস্তবতায় ফেলে, তাতে পদ্মাসেতু তাদের স্বপ্নের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে তা নিশ্চয়ই আনন্দের বিষয় হবে। তবে যে কোনো স্বপ্নেরই অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রতিবেশগত হিসাব-নিকাশগুলো জনগণের মাঝে আলাপে নিয়ে আসাটা জরুরি। গণমাধ্যমের সেই কাজটা করার কথা। বাংলাদেশে এই বিষয়টা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। 

 

 

সংক্ষেপে বিষয়টা হলো এই যে, বাংলাদেশে আমরা এমন একটা পর্যায় পার করছি যেখানে একটা দিকে এত বিশাল সব ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ বাস্তবায়ন হচ্ছে দেশের মাঝে কোনো যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ না রেখেই। অন্যদিকে এই সব উন্নয়ন প্রকল্পকে একটা পবিত্র চেহারাও দেয়া হচ্ছে, যাতে এগুলো নিয়ে আলোচনার কোনো পরিবেশ দেশে আদৌ না থাকে। কিন্তু এই বাস্তবতা তৈরি হবার পেছনে গণমাধ্যম নিজেই একটা শর্ত তৈরি করে ফেলেছে, যেখানে তাদের নীরবতা, তাদের মৌন সমর্থন কিংবা ভীরুতা ভুল হোক, ঠিক হোক, আলোচনা, বিতর্ক এবং প্রশ্ন তোলার পরিসরকে একদমই অদৃশ্য করে দিয়েছে গোটা সমাজ থেকে।

 


আলোচনা না হবার কিংবা করতে না দেয়ার, রাজনৈতিক সংস্কৃতি যে লুণ্ঠনের অর্থনীতির জন্ম দিয়েছে, সেটাই আবার রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও অধঃপতন ডেকে এনেছে। সব মিলিয়ে আমরা অর্থনীতি ও রাজনীতির এই পতনের বিষচক্রে আটকা পড়েছি, যা বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্যই একটা তেতো উপলদ্ধিতে পরিণত হয়েছে। টুপ করে ফেলে দেয়া কিংবা চুবিয়ে তুলে আনার এই বাসনা এই দেশে তাই এত সহজে প্রকাশ করে ফেলতে পারছেন অনির্বাচিত ক্ষমতাসীনরা।