বুধবার ২৮শে মাঘ ১৪৩২ Wednesday 11th February 2026

বুধবার ২৮শে মাঘ ১৪৩২

Wednesday 11th February 2026

মতামত

মিডিয়া রিফর্ম কমিশন: প্রতিশ্রুতি, সম্ভাবনা আর সীমাবদ্ধতার হিসাব

২০২৬-০২-১০

মীর হুযাইফা আল-মামদূহ
গবেষক, দৃক

মিডিয়া রিফর্ম কমিশন: প্রতিশ্রুতি, সম্ভাবনা আর সীমাবদ্ধতার হিসাব

সরকারি চাকরীতে কোটা সংস্কারের দাবীতে আন্দোলন তীব্রতা লাভ করে চীন সফর শেষে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে। ১৪ জুলাই ২০২৪ অনুষ্ঠিত সেই সংবাদ সম্মেলনে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে প্রধাণমন্ত্রী একটা দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেন। ‍সেখানে একজন সাংবাদিকের একটা প্রশ্নের আন্দোলনকারীদের রাষ্ট্র পরিচালনা ও সংবিধান সংশ্লিষ্ট মৌলিক বোঝাপড়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। আন্দোলনকারীদের পরোক্ষভাবে রাজাকার অাখ্যা দিয়ে বলেন, “কোটা মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরা পাবে না, তো রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে?” তার এই মন্তব্যের পরপরই ক্যাম্পাস ও রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে প্রতিরোধের স্লোগান, “তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার! কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!

 

জুলাইয়ের পরবতী দিনগুলোতে মিডিয়ার সাথে জনগণের দুরত্ব অারও স্পষ্ট হয়। ১৮ই জুলাই ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী, পুলিশের গুলিতে মৃতু্বরণের অাগে মীর মুগ্ধের শেষ ফেসবুক পোস্টগুলোর একটি ছিলো, “ একটা জিনিস মাথায় রাখবেন, আপনি আমিই এখন মিডিয়া। দেশে আর কোনো মিডিয়া নাই! যারা ছিলো তারা নিজেদের বেইচ্চা দিছে।জুলাই অান্দোলন চলাকালে যে মিডিয়া ব্ল্যাকঅাউটের চেষ্টা চলছিল তার প্রেক্ষিতে অনেক অান্দোলনকারীই গণমাধ্যম, সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে চায় নাই।


 
বিগত সরকারের সময় দেশীয় মিডিয়াগুলো মোটাদাগে সরকারের হয়েই কাজ করে যাচ্ছিল, ব্যতিক্রম দুই একটা বাদে। এই পুরো সময়ে মিডিয়ার মালিকানার জন্য আওয়ামী লীগের আজ্ঞাবহ হতে হত, মিডিয়া প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের এজেন্ডার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে নিতে হত। ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির আবেদনে সালমান এফ রহমান ও নাজমুল হাসান পাপন আওয়ামী লীগ সরকারের কর্মসূচী বাস্তবায়নে অবদান রাখার প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়াও গ্লোবাল টিভির জন্য আবেদন করেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ, আবেদনপত্রে তিনি বলেন, “চ্যানেলটি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে উজ্জীবিত একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও দারিদ্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে সম্প্রচারে যেতে চায়আর সেই অঙ্গীকারই বাস্তবায়ন করে গিয়েছে পুরো অাওয়ামী শাসনামলে, বিশেষ করে আন্দোলনকালীন সময়ে দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলো আন্দোলনে আহত নিহতের খবর উল্লেখ করেনি, বরং অনেকেই আন্দোলনকারীদের দুষ্কৃতিকারী বলে অভিহিত করেছে।

 

তাছাড়া, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাংবাদিকেরা সরকারের নানা সুবিধা পেয়েছে, প্লট, ফ্ল্যাট থেকে শুরু করে বিদেশ ভ্রমণসহ নানাকিছু। ফলে জনস্বার্থে সাংবাদিকতার বদলে তারা সরকারী প্রপাগণ্ডাকেই বেছে নিয়েছে।  ২৪ জুলাই ২০২৪ বিগত প্রধাণমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিক নেতাদেরদের নিয়ে জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি বৈঠক করেন যেখানে, বাসসের সংবাদ মতে, বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার সাবেক সম্পাদক নঈম নিজাম আন্দোলনকারীদের নাশকতাকারীউল্লেখ করে তাদের খুঁজে বের করে আইনী প্রক্রিয়ায় শাস্তির আওতায় আনার কথা বলেছেন, অন্যান্য সাংবাদিক নেতারাও শেখ হাসিনার সাথে থাকার অঙ্গীকার করেন, এবং বলেন, ‘তারা শেখ হাসিনার জন্য যে কোন কিছু করতে প্রস্তুত 



তাছাড়া  আওয়ামী আমলে সরকার কর্তৃক গণমাধ্যম নিপীড়নমূলক আইন প্রণয়ন এবং সেই আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার জনস্বাথে সাংবাদিকতার পথ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনা সরকারের পতনের পর সকল পক্ষই  আমাদের দেশীয় গণমাধ্যমের সংস্কারের জরুরত্ব অনুভব করেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে গণমাধ্যম সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। ১৮ অক্টোবর, ২০২৪ তারিখে ১১ সদস্যের একটি কমিশন গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন কামাল আহমেদ। সাংবাদিক, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত এই কমিশন প্রায় ১৮০ পৃষ্ঠার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করে, যেখানে ৪৫ হাজার পাঠকের মতামত, সরকারি নথি ও দেশের নানা স্থানে আয়োজিত মতবিনিময় সভার থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে গণমাধ্যমের মালিকানা, টেকসই বিজনেস মডেল, সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ তথা সার্বিকভাবে সংস্কারের একটি রূপরেখা প্রদান করেন।

 

কমিশনের রিপোর্ট প্রশংসার দাবী রাখে

 

অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে গঠিত মিডিয়া রিফর্ম কমিশন একটি প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ—মূলত গণমাধ্যম খাতে বহুদিন ধরে জমে থাকা কাঠামোগত সংকটকে নীতিগত আলোচনার কেন্দ্রে আনার একটি সুযোগ।প্রথমেই উল্লেখযোগ্য দিক হলো কমিশনের গঠন। এতে সাংবাদিক, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, মালিকপক্ষ এবং শিক্ষার্থী প্রতিনিধি, সব পক্ষকেই অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা হয়েছে। এর ফলে রিপোর্ট তৈরির সময়ে একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গির বদলে নানা অংশীজনের মতামত প্রতিফলিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের কণ্ঠ শোনার জন্য ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরগুলোতে এবং পার্বত্য জেলাতেও মতবিনিময় সভা আয়োজন করা হয়েছিল। এতে রাজধানীকেন্দ্রিক অালোচনার ধারা ভেঙে গণমাধ্যমের সার্বিক চিত্র উঠে এসেছে।

 

প্রতিবেদনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর বিষয়গত ব্যাপ্তি। প্রায় ১৮০ পৃষ্ঠার এই দলিলে কেবল তথ্যের পরিমাণ নয়, বরং গণমাধ্যম কাঠামোর বিভিন্ন স্তর—স্বাধীন সাংবাদিকতার বাধা, রাষ্ট্র ও আইনগত নিয়ন্ত্রণ, মালিকানা ও ব্যবসায়িক মডেল, সাংবাদিকদের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা, এবং জেন্ডার, আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই ধরনের বহুমাত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনার উদাহরণ আমাদের দেশে খুব কম পাওয়া যায়।

 

কমিশনের বিশেষ কৃতিত্ব হলো ইতিহাসকে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা। স্বাধীনতার পর থেকে কোন সরকারের সময়ে সাংবাদিকরা কেমন নিপীড়িত হয়েছেন, গণমাধ্যমের মালিকানা কীভাবে দলীয় ঘনিষ্ঠদের হাতে গেছে, এমনকি এক সরকার থেকে অন্য সরকারে নেতৃত্ব বদলের সময়ে সাংবাদিকদের অবস্থান কীভাবে পাল্টেছে, এসব খোলাখুলি বলা হয়েছে। এই আত্মসমালোচনার জায়গাটা নতুন, এবং রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে এসব বলার সাহস প্রশংসনীয়।

 

আবার, মালিকানা নিয়ে যেভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও ও অনলাইন পোর্টালের মালিকানার ইতিহাস, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় ও হাতবদলের প্রক্রিয়া, এসব তথ্যভিত্তিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একইসাথে বাজার নিয়ন্ত্রণ, ভুঁইফোড় সংবাদপত্র, এবং বিজ্ঞাপন বন্টনে অস্বচ্ছতা নিয়েও খোলামেলা আলোচনা করা হয়েছে।

 

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিয়ে রিপোর্টে যে নিরপেক্ষ সমালোচনা এসেছে, সেটিও প্রশংসার দাবিদার রিপোর্টে উল্লেখ হয়েছে, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৭২ সালে এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ টেলিভিশন সরকারি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়, তাতে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবর্তে সরকারনির্ভর প্রচারযন্ত্রে রূপ নেয় বিটিভি। দলীয় প্রচারের নমুনা তুলে ধরতে গিয়ে একজন প্রযোজকের মন্তব্য নেওয়া হয়েছে রিপোর্টে। প্রযোজক বলেছেন, বিটিভির অনুষ্ঠানে “সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম” এর বদলে “আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন” বলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাও মূলত সরকারী প্রচারযন্ত্র বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রোপাগান্ডা যন্ত্রের রূপ নেয়। সরকারের আজ্ঞাবহরা এসব প্রতিষ্ঠানে চাকুরি পেতে তদবির করে, ক্রমান্বয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাংবাদিকের বদলে অসাংবাদিকের আধিক্য বেশি হয়ে গিয়েছে। একইসাথে প্রতিষ্ঠানগুলো সাংবাদিকের বদলে আমলানির্ভর হয়ে গিয়েছে বলেও উল্লেখ হয়েছে রিপোর্টে।

 

সবশেষে, মালিকানা কাঠামো, শ্রম অধিকার, আইনি পরিবেশ, পেশাগত নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যম পরিচালনার প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতাগুলো যেভাবে রিপোর্টে চিহ্নিত হয়েছে, সুপারিশগুলো সেই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরির চেষ্টা করেছে। এখানে কেবল বর্তমান সংকটের বর্ণনা নয়, একই সাথে ভবিষ্যত নীতিনির্ধারণের জন্য একটি প্রস্তাবিত দিকনির্দেশও উপস্থাপন করে। হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর এতে নেই, কিন্তু এই রিপোর্টটি বাংলাদেশের গণমাধ্যম সংস্কারের আলোচনায় একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করবে।

 

রিপোর্ট পূর্ণাঙ্গতা পেতো, যদি

 

গণমাধ্যম কমিশনের রিপোর্টে ঘাটতির বেশ কয়েকটি জায়গা আছে। তারমধ্যে অন্যতম হচ্ছে, কমিশন নরমেটিভ বোঝাপড়া থেকে মিডিয়াকে দেখেছেন, এর ফলে গণমাধ্যমকে কেবল গণমাধ্যম হিসেবেই দেখা হয়েছে, যেন গণমাধ্যমে, গণমাধ্যমের বাইরের আর কোন চাপ নেই, যোগসাজশ নেই। গণমাধ্যম সত্য ও নিরপেক্ষ তথ্যের প্রচারযন্ত্র নিছক। অথচ আদতে গণমাধ্যম কখনও তা নয়, বরং গণমাধ্যম পরিচালিতই হয় তার মালিকের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার পুর্ণতা দেওয়ার জন্য। যেমন, বসুন্ধরা গ্রুপের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম আছে, পত্রিকা, টেলিভিশন থেকে শুরু করে রেডিও সবই। বসুন্ধরা গ্রুপের এত মিডিয়ার পেছনে বলা হয় তাদের জমি ব্যবসায়ের সুরক্ষার কথা। কিংবা আমরা যদি মুনিয়া হত্যার ঘটনাকেই বিবেচনা করি, বসুন্ধরার প্রতিটি মিডিয়া মুনিয়ার চরিত্র হনন করেছে মালিকের স্বার্থ রক্ষার্থে। একই সাথে যিনি মিডিয়া মাফিয়া হন, তার মন জুগিয়ে চলতে হয় বাকি গণমাধ্যমের, ফলে তারাও সেই মাফিয়া মালিককে আর ঘাটান না, বরং তার স্বার্থই দেখেন। মুনিয়া ঘটনার সময়েই আরও বেশ কয়েকটি মিডিয়া বসুন্ধরার দেওয়া সংবাদ হুবহু ছেপেছিল।

 

কমিশন গণমাধ্যমকে ঠিক ইন্ডাস্ট্রি আকারে দেখতে পারেনি। গণমাধ্যম কেবল সেবামূলক নয়, বরং মুনাফাভিত্তিক ইন্ডাস্ট্রি। মুনাফার সঙ্গে আসে পুঁজির নিয়ন্ত্রণ, আর পুঁজির নিয়ন্ত্রণ মানেই ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার দায়িত্বে মৌলিক দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়া। এই সংকট বোঝা ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতি বোঝা অসম্ভব। বরং, রিপোর্টের কিছু ক্ষেত্রে নরমেটিভ থিউরি অনুযায়ী রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ আকারে দেখার চেষ্টা করেছে, একই সাথে আবার কোথাও দেখা হয়েছে ইন্ডাস্ট্রির মত করে। এর ফলে গণমাধ্যমের উপর কখনও চতুর্থ স্তম্ভের দায় চাপিয়েছেন, আর কোথাও ইন্ডাস্ট্রির দায়। তাত্ত্বিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে এই ফাঁক, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কমিশনকে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সমস্যার গোঁড়াতেই হাত দিতে দেয়নি বলেই মনে হয়েছে।

 

একপাক্ষিকতা আছে ঐতিহাসিক বয়ানে

 

রিপোর্ট ঐতিহাসিকভাবে খানিকটা একপাক্ষিক বয়ান দিয়েছে বলেও মনে হয়েছে। বিগত সরকারের নিপীড়নের কথা এসেছে, কিন্তু সামরিক শাসন ও বিএনপি আমলের দমন-পীড়ন তুলনামূলকভাবে প্রায় এড়িয়ে গেছে। ১৯৮০–এর দশকে তাঁর শাসনামলে সমালোচনামূলক কন্টেন্ট প্রকাশের কারণে বহু পত্রিকা ও সাময়িকী বন্ধ হয়ে যায়, বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে একের পর এক প্রকাশনা নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকারের অধীনে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধকে অন্তত দুই পর্যায়ে দেখা যায়, ১৯৯১–১৯৯৬ এবং ২০০১–২০০৫ সালে। নব্বইয়ের দশকে সরাসরি সেন্সরশিপের পাশাপাশি পরোক্ষ আর্থিক চাপ—বিশেষ করে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া—সমালোচনাকারী পত্রিকাগুলোকে শাস্তি দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়; দৈনিক জনকণ্ঠ তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০০৬ সালে শ্রম আইন প্রণয়নের মাধ্যমে Newspaper Employees (Conditions of Service) Act, 1974 বাতিল করে সাংবাদিকদের জন্য পৃথক শ্রম-আইনি সুরক্ষা কাঠামোও তুলে দেওয়া হয়, ফলে পেশাগত স্বাধীনতা ও সংগঠিত দরকষাকষির অনেকগুলো অর্জন আবার সাধারণ শ্রম আইনের অধীনে লে যায়। এই সামগ্রিক ধারাবাহিকতাকে উপেক্ষা করে কেবল সাম্প্রতিক একটি সরকারের ওপর নিপীড়নের বর্ণনা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় রিপোর্টের ঐতিহাসিক বয়ান আংশিক থেকে গেছে।

 

২০০১-২০০৫ সময়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। সহিংসতা, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড বেড়ে যায়। টিপু সুলতান, মানিক সাহা ও হুমায়ুন কবির বালুর মতো সাংবাদিকরা হামলার শিকার হন বা নিহত হন। এসব ঘটনায় সরকার-সমর্থিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও ধর্মীয় চরমপন্থীরা জড়িত থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একই সময়ে সরকার সরাসরি সম্প্রচার মাধ্যমকেও টার্গেট করে। ২০০২ সালে একুশে টেলিভিশনকে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা ছিল গণমাধ্যম দমনের চূড়ান্ত উদাহরণ। উভয় সময়ে সাংবাদিকরা প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেন, বিক্ষোভ, মানববন্ধন এবং ফোরাম টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস'-এর মতো সংগঠন গঠন করে পেশাগত স্বাধীনতার লড়াই চালিয়ে যান।

 

নিউ মিডিয়াকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে

 

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের রিপোর্টে আরেকটি বড় ঘাটতি হলো নিউ মিডিয়ার অনুপস্থিতি। কমিশনের রিপোর্টে কেবল সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও কিছু অনলাইন পোর্টালের কথা এসেছে। অথচ আজকের গণমাধ্যম বাস্তবতা পুরোপুরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর। সংবাদপত্র ভিডিও কন্টেন্ট বানাচ্ছে ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের জন্য; টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও আলাদা ইউটিউব কন্টেন্ট তৈরি করছে এবং প্রচারিত অনুষ্ঠান সামাজিক মাধ্যমের উপযোগী করে সম্পাদনা করছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের আয়ের বড় অংশ এখন ইউটিউব থেকে আসে।

 

গণমাধ্যমের চরিত্রও আমূল বদলে গেছে। আগে একটি সংবাদপত্র মানেই ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ কন্টেন্ট, টেলিভিশনের বুলেটিনও ছিল একসাথে উপস্থাপিত সংবাদ। এখন আর তা নেই। ইউটিউব ও সামাজিক মাধ্যমে প্রতিটি ভিডিও বা সংবাদই আলাদা বাজার তৈরি করছে। প্রতিটি খবর আলাদা পণ্য হয়ে উঠছে, আর তার টিকে থাকা বা হারিয়ে যাওয়া নির্ভর করছে প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের ওপর।

 

সামাজিক মাধ্যমের এই উৎকর্ষ কিংবা বহুল প্রসারের ফলে ভুল বা অপতথ্যের ছড়াছড়িও বেড়ে গেছে, কারণ সামাজিক মাধ্যম প্রায় প্রত্যেককেই সংবাদ সরবারাহের একটি সুযোগ দেয়, ফলে যে কেউ-ই যে কোন কিছুকে সংবাদ আকারে চালিয়ে দিতে পারে। দেয়ও, এবং নানা ক্ষেত্রে এসব ভুল বা অপতথ্য ছড়িয়ে যায়। কমিশনের রিপোর্ট তথ্যের সঠিকতার আলাপ করেছেন, কিন্তু আবার একইসাথে সামাজিক মাধ্যমের সংবাদ মাধ্যম হয়ে ওঠা নির্দেশ করেনি রিপোর্টে। ফলে গণমাধ্যমের পরিবতনশীলমৌলিক চরিত্র আলোচিত হয়নি।

 

লাভ ক্ষতির পূর্ণ বিশ্লেষণ নেই

 

রিপোর্টের আরেকটি বড় ঘাটতি হলো লাভ-ক্ষতির বিশ্লেষণ না থাকা। একটি মিডিয়ার আয় আসে নানা উৎস থেকে, প্রিন্ট কপি বিক্রি, ই-পেপার সাবস্ক্রিপশন, অনলাইন ও করপোরেট বিজ্ঞাপন, সামাজিক মাধ্যমের ভিডিও কন্টেন্ট। প্রথম আলোর মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এই বহুমুখী আয়ের বাস্তবতা বিদ্যমান। কিন্তু কমিশনের রিপোর্টে এই হিসাব নেই। থাকলে বোঝা যেত কোন খাত মিডিয়াকে টিকিয়ে রাখছে, বা কোথায় তাদের টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এবং নানা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো তার কোন স্বার্থ রক্ষার্থে দীর্ঘদিন লোকসান দিয়েও গণমাধ্যমকে টিকিয়ে রাখছে, সেই বিষয়েও বিস্তারিত আলাপ করা হয়নি। বিস্তারিত আলাপ হলে গণমাধ্যমগুলোর পলিটিকাল ইকোনমি বুঝতে পারব। অনেক গণমাধ্যমের বিদেশী এনজিওর সাথে যুক্ততা আছে, পার্টনারশিপ আছে, সেই এনজিওদের পলিটিক্স কী, তারা গণমাধ্যমের সাথে এই পার্টনারশিপের মাধ্যমে কোন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়, সেটাও আলাপে আসা দরকার।

 

উত্তরণের প্রস্তাবও বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। মালিকানায় সবার অংশীদারত্বের ধারণা আকর্ষণীয় হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়। যৌথ উদ্যোগ টিকে থাকে কন্টেন্টের শক্তির ওপর; কন্টেন্ট দুর্বল হলে কোনো উদ্যোগই টেকে না। নন-প্রফিট গণমাধ্যমের জন্য সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় অর্থায়নের প্রস্তাবও এসেছে, কিন্তু তার স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন আছে। কেউ দীর্ঘদিন কেবল দায়বদ্ধতার খাতিরে অর্থ ঢালবে কেন? এর পেছনে কী রাজনীতি কাজ করবে? বাস্তবে ব্যবসায়ী গ্রুপগুলো ইতিমধ্যেই নিজেদের স্বার্থে গণমাধ্যমে অর্থ ঢালছে। কিন্তু কমিশনের রিপোর্টে এই রাজনৈতিক অর্থনীতির কোনো আলোচনা নেই।

 

ট্রেড ইউনিয়ন সাংবাদ শ্রমের জন্য জরুরি অনুষঙ্গ

 

আইনের দিক থেকে গণমাধ্যম ইতিমধ্যেই শ্রম আইনের অধীনে পরিচালিত হওয়ার কথা; সাংবাদিকদের ইউনিয়ন করার সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার রয়েছে, এবং ওয়েজ বোর্ডসহ ন্যূনতম সুরক্ষা কাঠামোও বিদ্যমান। কিন্তু বাস্তবে এই আইন কার্যকর করার কোনো রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক আগ্রহ নেই। বহু প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে সাংবাদিকদের ‘কর্মী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে না, কন্ট্রাক্ট বা কনট্রিবিউটর পরিচয়ে রাখে, যাতে শ্রমিক হিসেবে তাদের দাবি-দাওয়া অকার্যকর করা যায়। ফলে আইনের কাঠামো কাগজে থাকলেও newsroom-এ তা প্রযোজ্য হয় না।

 

সাংবাদিকদের দলবাজির বাইরে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারের প্রশ্ন বা সাংবাদিকতা একটি বিশেষায়িত বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের প্রসঙ্গটি রিপোর্টে অনুপস্থিত রয়ে গিয়েছে। সাংবাদিকদের এই ট্রেড ইউনিয়ন সঠিকভাবে না থাকার কারণে ইন্ডাস্ট্রি সংবাদ কর্মীদের যথেচ্ছ খাটাতে পারছে। স্বল্প ব্যয়ে সংবাদ শ্রমিক পাওয়া যাওয়াতে দেখা যাচ্ছে, ক্যারিয়ারের মধ্যম পর্যায়ের সাংবাদিকরা চাকরি খোয়াচ্ছেন, কারণ, তার বেতন দিয়ে একাধিক সাংবাদিক রাখতে পারবে গণমাধ্যমগুলো, ফলে সাংবাদিকতার মান যেমন পড়ে যাচ্ছে, একইসাথে অনেক সাংবাদিক চাকরি হারাচ্ছেন, অনিশ্চিত জীবনের সম্মুখীন  হচ্ছেন। সম্প্রতি আজকের পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের আত্মাহুতি সাংবাদিকতা পেশার অনিশ্চয়তাকে নতুন করে আলাপে এনেছে। ফলে, সাংবাদিকতা শ্রমের জন্য একটি শক্ত ট্রেড ইউনিয়ন থাকা জরুরি, যারা কেবল সাংবাদিকদের স্বার্থ নিয়ে কাজ করবেন।

 

এর সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কারণ জড়িয়ে আছে—অনেক সাংবাদিক নিজেরাও নিজেদের শ্রমিক হিসেবে ভাবতে চান না। পেশাটিকে মর্যাদার সাথে দেখার একটি প্রবণতা শ্রমিক পরিচয়কে ‘হীন’ কিছু মনে করায়। এই মনোভাব ইউনিয়নভিত্তিক সংগঠন দুর্বল করে, সদস্যপদ সীমিত রাখে, আর মালিকপক্ষের জন্য সংবাদকর্মীদের সহজে ব্যবহারযোগ্য করে তোলে। অর্থাৎ শুধুই মালিকদের দমন নয়; পেশাগত সংস্কৃতিও এখানে সংগঠিত শ্রমশক্তি তৈরির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

 

এই দ্বৈত সংকট—আইনের অকার্যকারিতা এবং শ্রমিক পরিচয়ের সংকোচ—মিলেই newsroom-এ স্থায়ী কাঠামো গড়ে ওঠে না। অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের চাকরি হারানো এবং মধ্যম পর্যায়ের কর্মীদের ‘cost-cutting’-এর কারণে বাদ দেওয়া আজ নিয়মে পরিণত হয়েছে। এখানে টেকসই টিম তৈরি হয় না, অনুসন্ধানী বা ঝুঁকিপূর্ণ সাংবাদিকতার পরিবেশ নষ্ট হয়, এবং গণমাধ্যমের পেশাগত স্বাধীনতা কমে যায়। এই অনিশ্চয়তার পরিবেশই সম্প্রতি আজকের পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের আত্মাহুতিকে আরেক দফা সামনে এনেছে—এটি শুধু ব্যক্তিগত হতাশা নয়; সাংবাদিকতার শ্রম-নিরাপত্তাহীনতার গভীর কাঠামোগত সংকটের এক নির্মম প্রতীক।

 

ফলে সাংবাদিক সুরক্ষা এবং গণমাধ্যম সুরক্ষা—এই দুই প্রশ্নকে আলাদা করে দেখা যায় না। শ্রম আইন বাস্তবায়ন, সংগঠিত ইউনিয়নের সক্ষম উপস্থিতি, এবং সাংবাদিকদের নিজেদের শ্রম পরিচয় গ্রহণ—এই তিনটি বিষয় একসাথে না হলে গণমাধ্যম টেকসই হবে না, আর সাংবাদিকদের জীবনও নিরাপদ হবে না।

 

সরকারি সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, সরকারি গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান হয়ত জরুরি, কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান কিছু সরকারী আজ্ঞাবহ মানুষ তৈরি করে, যা সাংবাদিকতা পেশাকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিগত সরকারের সময়ে আমরা দেখেছি, সরকারি আজ্ঞাবহ সংবাদ কর্মীরা আন্দোলনকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা ন্যায্য সাংবাদিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত ধারা

 

সকল সীমাবদ্ধতা সত্বেও গণমাধ্যম সংস্কারের যাত্রায় এই রিপোট‍টি একটি প্রাথমিক রূপরেখা। এতে মালিকানা, শ্রম অধিকার, বিজ্ঞাপন বাজার, রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি গণমাধ্যমের কাঠামো, সমঅধিকার ও গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা নিয়ে বিস্তৃত সুপারিশ আছে। কিন্তু সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট, নিউ মিডিয়ার অনুপস্থিতি, লাভ-ক্ষতির বিশ্লেষণ না থাকা এবং প্রস্তাবিত সমাধানের অকার্যকারিতা। অন্তবর্তীকালীন সরকার এই প্রতিবেদনটি গ্রহণ করে একটা গ্রুপ ছবি তোলার পরে আর প্রতিবেদনটির দিকে ফিরেও তাকান নাইবাংলাদেশে জনস্বার্থে সাংবাদিকতার বিকাশের জন্য আমাদেরকে এই প্রতিবেদন ও সংস্কারের প্রশ্নকে কবর দেয়ার প্রয়াসকে ব্যাহত করতে হবে এবং এই আলাপকে সচল রাখতে হবে।