সোমবার ১৯শে আষাঢ় ১৪২৯ Monday 4th July 2022

সোমবার ১৯শে আষাঢ় ১৪২৯

Monday 4th July 2022

বহুস্বর মতামত

“আমি মার খাইলাম, গুলি খাইলাম, কেড়ে নেয়া হচ্ছে শেষ সম্বলও”

২০২২-০৬-১৫

সজল কুন্ডু

আমি সজল কুন্ডু। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর শেষ করেছি। আমি সেই শিক্ষার্থী যে গত ১৬ জানুয়ারি ২০২২ এই  বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে প্রশাসনের মদদে ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য পুলিশি হামলার শিকার হয়ে আইসিইউতে ছিলাম। আমার শরীরে প্রায় ৮৩ টি স্প্রিন্টার বিদ্ধ হয়। ডান হাতটা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

আমার শারিরীক অবস্থা বিবেচনায় আমার জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও একটি চাকরির দাবি তুলেছিলেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা, পাইনি। আমার চিকিৎসার সম্পূর্ণ দেখভাল করার কথা থাকলেও অপারেশনের পরে আমার পোস্ট ট্রিটমেন্টের বিষয়ে আর কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। আমার ৩৪টা স্পিন্টার বিদ্ধ ডান হাতটা আজ প্রায় অকেজো। বুকে লাগা ২৩টা স্প্রিন্টার এর ২ টি স্প্রিন্টার লাংস এর কাছাকাছি বিদ্ধ হওয়ায় আমার মাঝে মাঝে শ্বাস আটকে যায়, বিষম লাগে, আমি দম নিতে পারি না। দুই পায়ে ৯ টার মত স্প্রিন্টার বিদ্ধ থাকায় এবং প্রচন্ড লাঠির আঘাতের কারনে প্রায় তিন মাস আমাকে ক্রাচে ভর দিয়ে চলাফেরা করতে হয়েছে। এবং আমার করোটিতে আরও দুটি স্প্রিন্টার বিদ্ধ আছে।

 

 

 

শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের প্রায় ৫ মাস পেরিয়ে গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দেয়া আশ্বাসের একটি দাবিও বাস্তবায়ন হয়নি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে করা একটা মামলাও প্রত্যাহার হয়নি। প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থীকে আসামি করে মামলা করা হয়েছিল। অন্যদিকে আমাদের সাবেক সিনিয়র যারা আমাদের সহযোগিতা করেছিলেন উনাদের মামলাগুলোও তোলা হয়নি। জামিনে থাকলেও প্রতিনিয়ত তাদের কোর্টে হাজিরা দিতে হচ্ছে। হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

 

সেইসময় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছিলেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে সকল মামলা উঠিয়ে নেয়া হবে এবং আমাদের দাবিগুলো বাস্তবায়িত হবে। মাসের পর মাস অতিবাহিত হলেও কোনো দাবির বাস্তবায়ন তো দূরে থাক আমাদের সাথে আর কেউ কোনো রকমের যোগাযোগও রাখেননি। আমরাও সংশ্লিষ্ট কেউ অবধি পৌঁছতে পারছি না। এই বিষয় নিয়ে একাধিকবার শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যারের সাথে আমাদের যোগাযোগ হলে তিনিও হতাশা প্রকাশ করেন। স্যারকে জিজ্ঞেস করলে স্যার হতাশা ব্যক্ত করে একটা কথাই বলেন, “আমাকে তো তারা কথা দিয়েছিল এখন কেন এমন করছে বুঝতে পারছি না।”

 

তবে সাস্টের শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি থেকে সরে আসেনি। সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেয়ার বিষয়ে কথা দেয়া হয়েছে এবং এর ওপর আস্থা রেখেই আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে। তাই আমরা আজও আস্থা রাখছি যে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো পূরণ করা হবে।

 

আমি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। আমার বাবা মারা যাবার পর ২০১৭ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে চা, মিষ্টি বিক্রি করে আমি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। পরিবারের দায়িত্ব পালন করি। কাকা বেঁচে নেই, কাকাতো দুই বোন এবং কাকীর দায়িত্বও রয়েছে। আমি এবছরের জানুয়ারীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইসিটি ক্যাফেটেরিয়ার বরাদ্দ পেয়েছিলাম। ১৫ দিনের মাথায় ১৬ জানুয়ারী আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুলিবিদ্ধ হই এবং ক্যাম্পাসের অচলাবস্থার কারনে ক্যাফেটেরিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

 

অপারেশনের পর এবং ক্যাম্পাস সচল হলে আমি পুনরায় ফেব্রুয়ারী ২৪, ২০২২ ক্যাফেটেরিয়া পুনরায় সচল করি। খোলার পর আমি লক্ষ্য করি যারা আমার কাজের প্রতি অনেক সন্তুষ্ট ছিলেন হঠাৎ করে তাদের কি যেন হয়েছে! নতুন-নতুন নিয়ম কানুন ও বিভিন্ন বিধি নিষেধ জারি হতে থাকে। কারণে অকারণে আমাকে শাসানো হতে থাকে আর বলা হতে থাকে আমি এইখানে থাকতে পারব না। আমাকে এখান থেকে বের করে দেয়া হবে। অপারেশনের পর আমি সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকতাম, এই বুঝি কোনো একজন স্যার আসবেন আর আমাকে শাসাতে শুরু করবেন। বিশ্বাস করবেন না, আমি ঐ সময়টাতে যে কী পরিমাণ মানসিক চাপ নিয়েছি সেটা বর্ণনাতীত।

 

গত রোজার ঈদের সময় সিকিউরিটির বিষয় দেখিয়ে আমার কাছ থেকে ক্যাফেটেরিয়ার চাবি নিয়ে নেয় প্রশাসন। ঈদের পর চাবি দেওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন তালবাহানা, নতুন নিয়ম ইত্যাদি দেখানো শুরু করে। উল্লেখ্য, প্রশাসন গত ২৮ মার্চ ক্যান্টিনের পুরাতন নীতিমালা বাতিল করে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করে যা উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং সঠিক ভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করার পক্ষে বেশ সাংঘর্ষিক। এখন প্রশাসন বলছে তারা পুনরায় দরপত্র আহ্বান করবে। অর্থাৎ আমাকে এখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।

 

আমি মার খাইলাম, গুলি খাইলাম, মানসিক নির্যাতনের স্বীকার হইলাম। আমাকে যর্থাথ চিকিৎসা দেওয়া হল না, ক্ষতিপূরণ দেওয়া হল না, একটা চাকরি দেওয়ার কথা ছিল সেটাও হল না। উল্টো আমার জীবিকা নির্বাহের শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এই অন্যায়ের বিচার আমি কার কাছে চাইব?

 

সজল কুন্ডু

শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়