শনিবার ১৯শে অগ্রহায়ণ ১৪২৯ Saturday 3rd December 2022

শনিবার ১৯শে অগ্রহায়ণ ১৪২৯

Saturday 3rd December 2022

বহুস্বর মতামত

কর্তৃত্ববাদী সরকার ও প্রচারণা: প্রক্রিয়া ও কৌশল বিশ্লেষণ

২০২২-০৮-০৭

সাইমুম পারভেজ

এই লেখাটি "সাম্প্রতিক বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী বয়ান: নির্মাণ ও প্রচারণা প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ" প্রবন্ধের তৃতীয় ও শেষ পর্ব। এই পর্বে বয়ান নির্মাণের পর তা কীভাবে বিতরণ করা হয় তা আলোচনা করা হয়েছে। বয়ানের প্রয়োজনীয়তা, প্রাসঙ্গিকতা, সংগঠনের কাঠামো,  মিডিয়া বাছাই, প্রচারণার আচার ও চিহ্ন, ভাষার ব্যবহার, ও মিডিয়ার উপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের কৌশলগুলো এই পর্বে বিশ্লেষণ করা হবে। এছাড়া বয়ান নির্মাণ ও প্রচারণাকে ঠেকাতে বিরোধী শিবিরের দুর্বলতা ও তিন পর্বের এই প্রবন্ধের প্রধান যুক্তিগুলোও সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হবে।

 

 

শুধু ব্যঙ্গচিত্র আঁকার জন্য, প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য, বিদেশী গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য বা সামাজিকমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করার জন্য হয়রানি, মামলা দায়ের ও অত্যাচারের ঘটনা ঘটছে

 

 

প্রোপাগ্যান্ডা বা কৌশলগত প্রচারণা ছাড়া কোনো বয়ান দ্বারাই কার্যকরীভাবে জনগণকে প্রভাবিত করা যায় না। প্রোপাগ্যান্ডা শব্দটি যদিও বেশিরভাগ সময় নেতিবাচক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এই শব্দটির মাধ্যমে শুরুতে ইতিবাচক প্রচারণাই বোঝানো হতো। প্রোপাগ্যান্ডা বিশ্লেষণ একটি জটিল প্রক্রিয়া। এর সাথে জড়িত ঐতিহাসিক গবেষণা, প্রোপাগ্যান্ডা বার্তা ও মিডিয়ার বিশ্লেষণ, অডিয়েন্সের সাড়া দেওয়া এবং সুচারুভাবে প্রোপাগ্যান্ডা প্রক্রিয়াকে বোঝার চেষ্টা। অনেক সময় সমাজে প্রচলিত সাংস্কৃতিক মিথ ও স্টিরিওটাইপ বা গৎবাঁধা চিন্তাকে প্রোপাগ্যান্ডা এমনভাবে অবলম্বন করে যে আলাদা করে কোনটা প্রোপাগ্যান্ডা সেটা বুঝে উঠা মুশকিল হয়ে উঠে।

 

 

প্রোপাগ্যান্ডা হচ্ছে একটি  সমন্বিত, সুপরিকল্পিত ও সুসংগঠিত প্রয়াস যার মাধ্যমে টার্গেট অডিয়েন্সের চিন্তা, ধারণা ও ব্যবহারকে প্রভাবিত করা যায়। যেহেতু প্রোপাগ্যান্ডার মূল বিষয় হচ্ছে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধন, তাই গবেষকদের জন্য অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে উদ্দেশ্য কে খুঁজে বের করা ও বিশ্লেষণ করা।

 

 

[পড়ুন "সাম্প্রতিক বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী বয়ান: নির্মাণ ও প্রচারণা প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ" প্রবন্ধের দ্বিতীয় পর্ব]

 

 

মতাদর্শ থেকেই বয়ান উদ্ভুত হয়। বয়ান গুরুত্বপূর্ণ কারণ সাধারণ মানুষ সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়গুলো বোঝার জন্য চিন্তার কাঠামো খোঁজে আর বয়ান সেই কাঠামো দেয়। [১] প্রোপাগ্যান্ডা বিশ্লেষণ করার জন্য টার্গেট অডিয়েন্সের বা উদ্দিষ্ট শ্রোতার মধ্যে বিদ্যমান বিশ্বাস, নীতি, আচরণ ও ব্যবহার বোঝা দরকার। এছাড়াও বোঝা দরকার কী ধরনের সামাজিক নর্ম সেই সমাজে রয়েছে, অর্থাৎ কী ধরণের নীতি সমাজ আশা করে এবং গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। এর আগের আলোচনায় দেখানো হয়েছে কীভাবে সমাজে বিদ্যমান মুক্তিযুদ্ধ, সেক্যুলারিজম ও ধর্মের বয়ানকে আওয়ামী লীগ ব্যবহার করেছে। ইতিহাস ও বিদ্যমান ঘটনার উপর নির্ভরশীল বলে এই বয়ান সহজে মানুষকে আকর্ষণ করেছে।  বয়ান একটি চিন্তাকাঠামো দিয়েছে যা বলে দিচ্ছে   ভালো-খারাপ, ন্যায়-অন্যায় ইত্যাদির বিভাজন। তাই বয়ান নির্মাণ ও বিতরণ এক ধরণের কনসেন্ট বা একমত হওয়া তৈরির প্রক্রিয়াও বটে। কারণ এর মাধ্যমে একটি বিশেষ ধরণের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও নিয়ম কানুনের প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করা হয়।

 

 

একটি সফল বয়ান ও এর প্রোপাগ্যান্ডা অতীতের ইতিহাস, বর্তমানের সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের স্বপ্নকে প্রোপাগ্যান্ডা থিমের সাথে মিশিয়ে দেয়। প্রোপাগ্যান্ডার সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রোপাগ্যান্ডার শিকারকে প্রভাবিত করা। কিছু সময় এই প্রোপাগ্যান্ডা শুধু কগনেটিভ বা সজ্ঞান স্তরেই থাকতে পারে। তার মানে প্রোপাগ্যান্ডা মানসিক স্তরে পৌঁছায় কিন্তু কী আচরণ করবে সেটা বার্তার মাধ্যমে তা নির্ধারণ করে দেয়না। তবে একটি কার্যকর প্রচারণা তাদের টার্গেট অডিয়েন্সের আচরণও প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

 

 

কোনো সংস্থা বা সরকারের কাজের বৈধতা দেবার জন্য এমন প্রোপাগ্যান্ডা দরকার পড়ে, যাতে প্রোপাগ্যান্ডার শিকার ব্যক্তিরা এতটাই অনুপ্রাণিত হয়ে পড়ে যে তারা নিজেরাই প্রচার ও রটনায় অংশ নেয়। সম্প্রতি পদ্মাসেতুর প্রচারণাকে একটি সফল প্রোপাগ্যান্ডা হিসেবে ধরা যেতে পারে। এখানে উন্নয়ন ও জাতীয়তাবাদী বয়ানকে ব্যবহার করে জনগণকে এতটাই প্রভাবিত করা হয়েছে যে তারা একটি অবকাঠামো নির্মাণকে জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। প্রথমদিকে শুধু সরকারী দলের সংগঠন ও সমর্থকরা এই প্রচারণায় অংশ নিলেও পরবর্তীতে প্রোপাগ্যান্ডার বয়ানকে সফলতার সাথে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে তাদের এই প্রচারণার সাথে একাত্ম ভাবতে প্রভাবিত করা হয়।

 

 

বিশেষ করে কোনো সংস্থা বা সরকারের কাজের বৈধতা দেবার জন্য এমন প্রোপাগ্যান্ডা দরকার পড়ে, যাতে প্রোপাগ্যান্ডার শিকার ব্যক্তিরা এতটাই অনুপ্রাণিত হয়ে পড়ে যে তারা নিজেরাই প্রচার ও রটনায় অংশ নেয়। সম্প্রতি পদ্মাসেতুর প্রচারণাকে একটি সফল প্রোপাগ্যান্ডা হিসেবে ধরা যেতে পারে। এখানে উন্নয়ন ও জাতীয়তাবাদী বয়ানকে ব্যবহার করে জনগণকে এতটাই প্রভাবিত করা হয়েছে যে তারা একটি অবকাঠামো নির্মাণকে জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে। প্রথমদিকে শুধু সরকারী দলের সংগঠন ও সমর্থকরা এই প্রচারণায় অংশ নিলেও পরবর্তীতে প্রোপাগ্যান্ডার বয়ানকে সফলতার সাথে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে তাদের এই প্রচারণার সাথে একাত্ম ভাবতে প্রভাবিত করা হয়।

 

 

প্রোপাগান্ডা ইন্টিগ্রেশন ও এজিটেশন দুই ধরণেরই হতে পারে। প্রথম ধারায় বিদ্যমান সরকার নিজেদের টিকিয়ে রাখতে ও নিজেদের কার্য়ক্রমকে বৈধতা দিতে সংহতি ও চলমান উন্নতির দোহাই দিতে পারে। দ্বিতীয় ধারায় যদিও বেশির ভাগ সময় সরকার বিরোধী আন্দোলন হয়ে থাকে, কিন্তু সরকার নিজেও তার প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে জনগণকে উসকে দিতে প্রোপাগান্ডা ব্যবহার করতে পারে। নাৎসি প্রোপাগ্যান্ডিস্ট জোসেফ গোয়েবলস এর মতে, প্রোপাগান্ডার কোনো নির্দিষ্ট মেথড নেই, শুধু উদ্দেশ্য আছে - আর সেই উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের মন জয় করা। [২]

 

 

কোন সংগঠন প্রোপাগ্যান্ডা চালাচ্ছে এবং সেই সংগঠনের গঠন কেমন তা গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো সফল প্রচারণা ও রটনার জন্য দরকার একটি শক্তিশালি ও কেন্দ্রীভূত সংস্থার সিদ্ধান্ত, যাদের বার্তা উৎপাদন ও বিতরণ প্রক্রিয়ায় সামঞ্জস্য থাকবে। যে কারণে এ ধরণের সংস্থায় নেতৃত্ব থাকে শক্তিশালী ও কেন্দ্রীভূত। কাঠামো শুধু কর্মকর্তা বা সংস্থা নয়, এর সাথে যুক্ত দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য (গোল) ও স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য (অবজেকটিভ)। উদ্দেশ্য সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হয় এবং এই উদ্দেশ্য পৌঁছাতে ছোট ছোট লক্ষ্য পূরণ করতে হয়। এই ছোট লক্ষ্যগুলো স্বল্পমেয়াদি এবং সহজে করা যায় এমন কিছু বেছে নিতে হয়। বাংলাদেশের বর্তমান কর্তৃত্ববাদী সরকারের যে প্রচারযন্ত্র তা সরকারী সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক সমর্থকদের সমন্বিত প্রয়াস। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে সমন্বয়ের উপরই নির্ভর করে প্রচারণার কার্যকারিতা।

 

 

একটি রাজনৈতিক দলকে বিশ্লেষণ করলে দেখতে হবে এর মধ্যে কি ধরণের সংস্কৃতি রয়েছে। সংস্কৃতি হচ্ছে কিছু অনানুষ্ঠানিক নিয়মকানুন যা মানুষ কী ধরণের আচরণ করবে তা ঠিক করে দিতে চায়। স্টুয়ার্ট হল সংস্কৃতিকে ব্যাখ্যা করেছেন জীবনাচারের একটি পথ হিসেবে যা একটি সমাজ, জাতি ও গোত্রের জীবনের উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরে ।[৩]

 

 

 তবে সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল এবং তা প্রত্যেকটি প্রজন্মেই নতুন করে তাদের সংস্কৃতি তৈরি করে। [৪]

 

 

আমাদের মনে রাখতে হবে সংস্কৃতি মানেই তা যে সমাজের জন্য ইতিবাচক হবে এমন কিছু নয়।  প্রত্যেকটি সমাজে কিছু সামাজিক মূল্যবোধ থাকে। এই মূল্যবোধ সমাজের সংস্কৃতি তৈরি করতে সহায়তা করে। হল এর মতে, সংস্কৃতি সমাজের সদস্যদের মধ্যে যেকোনো বিষয়ের মানে তৈরি এবং সেটি বিতরণ এ সহযোগিতা করে।[৫] এই মিনিং বা মানে তৈরির অংশ হিসেবেই কমন মতাদর্শের আলোচনা আসে, স্লোগান তৈরি হয়, রাজনৈতিক দলের সবাই এই কার্যক্রম ও মানের সাথে একমত হয়, বারবার ব্যবহার করে, আর এর মাধ্যমেই একটি সামাজিক অভ্যাস তৈরি করে এবং তা নিয়ন্ত্রন করে।

 

 

আওয়ামী সংস্কৃতির প্রধান চরিত্রকে মিথিকাল ও ক্যারিশমা সম্পন্ন বানানো হয়েছে বেশ সফল ভাবেই। ক্ষমতাসীন দলে বিভিন্ন রিচুয়াল বা আচারের মাধ্যমে দৃশ্যমান ও শক্তিমান ভাবে মতাদর্শকে ফুটিয়ে তোলা হয়। পোশাক, আচরনের অনুকরণ, তর্জনি, পাইপ, চশমা ইত্যাদি নানা প্রতীককে এই আচারের অংশে পরিণত করা হয়।

 

 

আওয়ামী সংস্কৃতির প্রধান চরিত্রকে মিথিকাল ও ক্যারিশমা সম্পন্ন বানানো হয়েছে বেশ সফল ভাবেই। ক্ষমতাসীন দলে বিভিন্ন রিচুয়াল বা আচারের মাধ্যমে দৃশ্যমান ও শক্তিমান ভাবে মতাদর্শকে ফুটিয়ে তোলা হয়। পোশাক, আচরনের অনুকরণ, তর্জনি, পাইপ, চশমা ইত্যাদি নানা প্রতীককে এই আচারের অংশে পরিণত করা হয়।

 

 

[পড়ুন "সাম্প্রতিক বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী বয়ান: নির্মাণ ও প্রচারণা প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ" প্রবন্ধের প্রথম পর্ব]

 

 

আধুনিক প্রোপাগ্যান্ডার নিয়ম মেনে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকার নানা ধরণের মিডিয়া ব্যবহার করছে। প্রেস, রেডিও, টেলিভিশন, ফিল্ম, সামাজিক মাধ্যম, ই-মেইল, টেলিফোন, পোস্টার, মিটিং, হ্যান্ডবিল, বিলবোর্ড, বক্তৃতা, পতাকা, রাস্তার নাম, মনুমেন্ট, মুদ্রা, ডাকটিকিট, স্মারক নোট, বই, নাটক, কমিক স্ট্রিপস, কবিতা, সংগীত, উৎসব, জাদুঘর প্রদর্শনী, খেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পুরস্কার, ফেলোশিপ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানসূচক চেয়ার, কোনো বিশেষবর্ষ, ধানের ক্ষেতে অবয়ব, স্ট্যাচু, অ্যানিমেশন, গ্রাফিক নভেল ইত্যাদি নানা মাধ্যমে এই প্রচারণা চালানো হচ্ছে। সামাজিকমাধ্যমে, বিশেষ করে ফেসবুকে ও টুইটারে ক্ষমতাসীন দলের সরব উপস্থিতি সহজেই নজর কাড়ে। রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের সাথে সাথে বেতনভুক্ত সাইবার কর্মীরাও প্রচার ও রটনায় অংশ নেয় বলে শোনা যায়। সামাজিক মাধ্যমের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, যারা সরাসরি সরকারি দলের সমর্থক নন, কিন্তু নাজুক সময়ে কর্তৃত্ববাদী সরকারের কার্যক্রম নরম সমালোচনার মাধ্যমে জায়েজ করেন, তারা মতামত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সামাজিকমাধ্যমের বাইরেও একটি বুদ্ধিজীবী শ্রেণী এই ভূমিকা রাখেন। কর্তৃত্ববাদী সরকারের এই সাংস্কৃতিক পুঁজির ব্যবহার তাদের পক্ষে জনমত গড়তে সহায়তা করে।

 

 

অনেক সময় ছোট ছোট বিষয়ও প্রচারণায় বড় ধরণের পরিবর্তন আনতে পারে। নয়োম চমস্কি স্নায়ুযুদ্ধের সময় আমেরিকার ভাষা ব্যবহার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, আমেরিকা সোভিয়েত ইউনিয়ন "পচনের বিস্তার" ঘটাচ্ছে, "ভাইরাস" হয়ে সংক্রমণ করছে ইত্যাদি ভাষা ব্যবহার করে প্রোপাগ্যান্ডা চালিয়েছে।[৬]

 

 

গত শতকের নব্বই এর দশকে রুয়ান্ডার গণহত্যার সময় হুতুরা তুতসিদের উপর গণহত্যা চালানোর আগে তাদের "তেলাপোকা" হিসেবে অবহিত করেছে। ভাইরাস বা তেলাপোকা বলার মাধ্যমে শত্রুকে "অমানবিককরণ" করে আক্রমণ করাকে বৈধ করার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে "রাজাকার-শাবক" (শাবক জন্তুর সাথে সম্পর্কযুক্ত) শব্দের ব্যবহার এরকম অমানবিককরণ এর উদাহরণ।

 

 

গত শতকের নব্বই এর দশকে রুয়ান্ডার গণহত্যার সময় হুতুরা তুতসিদের উপর গণহত্যা চালানোর আগে তাদের "তেলাপোকা" হিসেবে অবহিত করেছে। ভাইরাস বা তেলাপোকা বলার মাধ্যমে শত্রুকে "অমানবিককরণ" করে আক্রমণ করাকে বৈধ করার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে "রাজাকার-শাবক" (শাবক জন্তুর সাথে সম্পর্কযুক্ত) শব্দের ব্যবহার এরকম অমানবিককরণ এর উদাহরণ।

 

 

মজার বিষয় হচ্ছে, ইসলামিস্ট ও কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী, এই উভয় বয়ানের মধ্যেই ঘৃণা ও অমানবিককরণের প্রাবল্য লক্ষ্য করা যায়। ইসলামিস্টরা "নাস্তিক", "ইসলাম-বিরোধী", "ধর্ম অবমাননাকারী" ইত্যাদি তকমা দেয়। অন্যদিকে, আওয়ামী বয়ানে "রাজাকার-শাবক", "জামায়াত-শিবির", "রাজাকার" ইত্যাদি শব্দ দিয়ে সমালোচকদের ঘায়েল করা হয় ( সিপি গ্যং কর্তৃক সামাজিক মাধ্যমে সমালোচক বুদ্ধিজীবিদের "বুদ্ধিবেশ্যা" ও "চ-বর্গীয়" অশ্রাব্য গালিগালাজও এর উদাহরণ) । এই দুই শিবির-ই সমাজে ( Us vs Them) "আমরা বনাম তারা" বাইনারি বি‌ভাজন তৈরি করে ঘৃণার চর্চাকে জিইয়ে রাখে। [৭]

 

 

আবেগকে উসকে দিয়ে জনসাধারণকে নিজেদের বয়ানের পক্ষে আনা আরেকটি বিশ্বব্যপী বহুল ব্যবহৃত কৌশল। জাতীয়তাবাদের বয়ানে দেশপ্রেমের আফিমে বুঁদ হলে যুক্তি বেশিরভাগ সময়ই কাজ করে না। আওয়ামী লীগের তিনটি প্রধান বয়ান, মুক্তিযুদ্ধ, সেকুলারিজম/ধর্ম, ও উন্নয়ন, খুব সফলভাবে আবেগকে ব্যবহার করে আসছে। এর সহায়ক মাধ্যম হিসেবে গান, চলচ্চিত্র, কবিতা ও সাহিত্যের অন্যান্য শাখার ব্যবহার লক্ষ্য করার মতো। এই ধরণের সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক প্রোপাগ্যান্ডা, বিশেষ করে সঙ্গীত, খুবই কার্যকর কারণ এই মাধ্যমগুলো আবেগ তাড়িত করে, স্মৃতিকে, অতীতকে ফিরিয়ে আনে এবং দর্শক-শ্রোতাকে বয়ানের সাথে একাত্ম করে ফেলে। ভিজ্যুয়ালি, বড় পতাকা, প্রোট্রেট, মনুমেন্ট তাদের বিশালত্ব দিয়ে দর্শকের মনে প্রভাব ফেলে। যুগে যুগে একনায়করা, সেটা হিটলার, মুসোলিনি বা হালের উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন, বিশাল "লার্জার দ্যান লাইফ" ছবি ও মনুমেন্ট বানিয়েছেন কারণ তা শক্তির ও সামর্থের নির্দেশক। বাংলাদেশের কর্তৃত্ববাদী সরকার প্রচারণার এই পুরনো কৌশলও ব্যবহার করছেন।

 

 

বাংলাদেশের কর্তৃত্ববাদী সরকারের প্রচারণা কৌশলের আরেকটি উল্লেখ্যযোগ্য বিষয় হচ্ছে গ্রুপ-বিহেভিয়ার বা সংঘবদ্ধ আচরণ। গ্রুপ নর্মস হচ্ছে একটি গ্রুপের বিশ্বাস, মতাদর্শ ও আচরণ যা প্রত্যেক গ্রুপ মেম্বারের আচরণকে প্রভাবিত করে। গ্রুপ আচরণ নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রুপের সিদ্ধান্তে বেশিরভাগ সময় মানুষ একমত হয় এমনকি যদি ব্যক্তিজীবনে তার দ্বিমতও থাকে ।[৮]

 

 

সংঘবদ্ধ আচরণ করতে গিয়ে, সেই গ্রুপে বা সংঘে যদি অসহিষ্ণু মানুষ থাকে, তবে অন্যরাও বেশিরভাগ সময়ই তাদের ব্যক্তিজীবনের চাইতে উগ্র আচরণ করে। হার্ড ইন্সটিংক্ট বা "গোত্রে থাকার পশুজাত প্রবৃত্তি" কে ব্যবহার করে বয়ান-ভিত্তিক উগ্র আচরণের জন্ম দিতে পারে। বাংলাদেশের সামাজিকমাধ্যমে, বিশেষ করে ফেসবুকে এই গোত্রবদ্ধ উগ্রতার নজির আমরা অহরহ দেখতে পাই।

 

 

প্রচারণা কৌশলের সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হচ্ছে যোগাযোগ উৎসে মনোপলি বা একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করা। এই প্রবন্ধের শুরুতেই দেখানো হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রধান শিকারদের মধ্যে অন্যতম সাংবাদিকরা। এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোর অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম এর ঘটনাটি উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি ২০২১ সালের ১৮ মে দুর্নীতির অনুসন্ধান করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় গোপন নথি সরানোর অভিযোগে আটক ও গ্রেফতার হন। শুধু ব্যঙ্গচিত্র আঁকার জন্য, প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য, বিদেশী গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য বা সামাজিকমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করার জন্য হয়রানি, মামলা দায়ের ও অত্যাচারের ঘটনা ঘটছে। এ ধরণের হয়রানির মাধ্যমে স্বাধীন গণমাধ্যমের কন্ঠরোধ করা হয়েছে। একদিকে স্বাধীন গণমাধ্যমকে চাপে রেখে, অন্যদিকে দলীয় সমর্থক ও চাটুকার সাংবাদিকদের নানা সুযোগ করে দিয়ে সংবাদের উৎসে নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এইভাবে কর্তৃত্ববাদী সরকারের অনুকূল বয়ানকে সমন্বিতভাবে জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়।

 

 

উপসংহার

বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনীতি সম্পর্কিত বয়ান নির্মাণ ও প্রচারণা একটি জটিল প্রক্রিয়া। ক্ষুদ্র পরিসরে এই জটিল প্রক্রিয়াকে তুলে ধরা কঠিন। এই প্রবন্ধে সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কর্তৃত্ববাদী সরকারের টিকে থাকার পেছনে কিভাবে তিনটি বয়ান কাজ করছে তা তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম পর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধে কেন্দ্রীক একটি মহান বয়ান তৈরি করেছে, যাতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, নেতৃত্ব ও ঘটনাবলীর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এই মহান বয়ানে স্বাধীনতা সংশ্লিষ্ট অবদানের জন্য বাংলাদেশকে শাসন করার অধিকার তাদের রয়েছে বলে এই দলের নেতারা মনে করেন। একই সূত্র ধরে দলটির সমালোচনাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সমালোচনার সমর্থক হিসেবে পরিণত করা হয়েছে।  দ্বিতীয় পর্বে বিশ্লেষণ করা হয়েছে কিভাবে সাম্প্রতিক আওয়ামী লীগ একটি ডানপন্থী দল হয়েও তার সেক্যুলার পরিচিতি বজায় রেখেছে। একইসাথে সেকুলারিজম ও ধর্মীয় বয়ান ব্যবহার করে শাসন ক্ষমতার বৈধতার পক্ষে নিজেদের বয়ান তৈরি করেছে। এছাড়া অবকাঠামোগত দৃশ্যমান উন্নয়নের বয়ান দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ ও উন্নয়নকে এক সাথে করে উন্নয়নকে একটি অলঙ্ঘনীয় ও প্রশ্নাতীত জায়গায় নিয়ে গিয়েছে যেখানে দুর্নীতির অনুসন্ধানের চাইতে অবকাঠামোর উদযাপন বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই তিনটি বয়ানই ক্ষমতাসীন কর্তৃত্ববাদী সরকারকে "বিকল্পহীন" হিসেবে উপস্থাপিত করে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিকে জায়েজ করার চেষ্টা করে।

 

 

এই প্রবন্ধের তৃতীয় ও শেষ পর্বে বয়ান নির্মানের পর তা কিভাবে বিতরণ করা হয় তার উপরেও আলোকপাত করা হয়েছে। বয়ানের প্রয়োজনীয়তা, প্রাসঙ্গিকতা, সংগঠনের কাঠামো,  মিডিয়া বাছাই, প্রচারণার আচার ও চিহ্ন, ভাষার ব্যবহার, ও মিডিয়ার উপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের কৌশলগুলো তুলে ধরা হয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, ক্ষমতাসীন সরকারের বিরোধী শক্তিরাও কি এ ধরণের প্রচারণা কৌশল ব্যবহার করে প্রতি-প্রচারণা চালাতে পারেনা? বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, বিরোধী শিবিরের উদ্যোগগুলো বেশির ভাগ সময়ই সমন্বিত, সুপরিকল্পিত ও সুসংগঠিত নয়।

 

 

একথা ঠিক যে ক্ষমতাসীন দল যেভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে, ব্যাপক অর্থবল ও জনবলকে কাজে লাগাতে পারে, বিরোধী দলের তার সুযোগ নেই। কিন্তু এমন কী যেখানে এ ধরণের লজিস্টিক সমর্থন কম প্রয়োজন, যেমন সামাজিকমাধ্যম বা দলীয় ওয়েবসাইট, সেখানেও বিরোধী দলের দুর্বল অবস্থান, সমন্বিত ও সুসংগঠিত পরিকল্পনার অভাব। এই প্রবন্ধে যেসব প্রচারণা কৌশলের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, তার বেশীর ভাগই ক্ষমতাসীন দল বাদে বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে শেখেনি। রাজপথের আন্দোলন ও প্রচলিত প্রতিবাদের সাথে সাথে কার্যকর বয়ান নির্মাণ ও বিতরণ না হলে যেকোনো কর্তৃত্ববাদী সরকারকে অপসারণ কষ্টকর, আগামী দিনের বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হবার কথা নয়।

 

 

সাইমুম পারভেজ

বেলজিয়ামের ফ্রাই ইউনিভার্সিটি ব্রাসেলস-এর রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক। 

ইমেইল অ্যাড্রেস: [email protected]

 

 

 

তথ্যসূত্র :    

[১] Kecskemeti, P. (1973). Propaganda. In I. D. Pool, F. W. Frey, W. Schramm, N. Maccoby, & E. B. Parker (Eds.), Handbook of communication (pp. 844–870). Chicago: Rand McNally. pp. 849-850.

[২] Jowett, G.S. & O’Donnell, V. (2012). Propaganda and Persuasion. SAGE: Los Angeles. p.272

[৩] Hall, S. (Ed.). (1997). Representation: Cultural representations and signifying prac­tices. Thousand Oaks, CA: Sage.

[৪] Wilson, E. O. (1998). Consilience: The unity of knowledge. New York: Knopf.

[৫] Hall, S. (1980). Cultural studies: Two paradigms. Media, Culture, and Society, 2(1), pp. 57–72.

[৬] Chomsky, N. (1992). A view from below. In M. J. Hogan (Ed.), The end of the Cold War: Its meanings and implications (pp. 137–150). Cambridge, UK: Cambridge University Press, p. 141.

[৭] Parvez S. (2022) Understanding the Shahbag and Hefajat Movements in Bangladesh: A Critical Discourse Analysis. Journal of Asian and African Studies. 57(4):841-855

[৮] Karlins, M., & Abelson, H. I. (1970). Persuasion: How opinions and attitudes are changed. New York: Springer, pp. 41–67; Pratkanis, A. R., & Aronson, E. (2001). Age of propaganda: The everyday use and abuse of persuasion (2nd ed.). New York: Freeman., pp. 167–173)