শনিবার ১৯শে অগ্রহায়ণ ১৪২৯ Saturday 3rd December 2022

শনিবার ১৯শে অগ্রহায়ণ ১৪২৯

Saturday 3rd December 2022

বহুস্বর মতামত

গুমের রাজনীতি ও সাম্প্রতিক বাংলাদেশ

২০২২-০৮-৩০

ড. সাইমুম পারভেজ

বলপূর্বক অন্তর্ধান বা গুম একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ।  এই প্রবন্ধে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং গুমের রাজনীতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। গুম সাধারণত: তিনটি উদ্দেশ্যে কর্তৃত্ববাদী সরকার করে থাকে। প্রথম, কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী সরকার যাদের নিজের ক্ষমতায় টিকে থাকার পেছনে বড় ধরনের বাধা মনে করে তাদের কৌশলগতভাবে  নির্মূল করা। দ্বিতীয়, এর মাধ্যমে সহিংসতার একটি নতুন ধরণ তৈরি করা, যাতে ভিক্টিমের পরিবার ও সমাজ একটি অনিশ্চিত বেদনার মধ্যে থাকে এবং সামগ্রিক সমাজব্যবস্থায় একটি ভয়ের অচলাবস্থা তৈরি হয়। তৃতীয়, ভিক্টিমকে অপহরণ করে, আটকে রেখে, কিছু ক্ষেত্রে হত্যা করে তাদের অস্তিত্বকে বিলীন করে দেয়া, আর এর মাধ্যমে এই অপরাধকে লুকিয়ে ফেলা। এই প্রক্রিয়ায় কৃত অপরাধকে কর্তৃত্ববাদী সরকার অস্বীকার করতে চায় এবং এই অপরাধের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা পাবে বলে মনে করে। যদিও এ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে দেশে দেশে অনেক কর্তৃত্ববাদী সরকার ক্ষমতা হারানোর পরে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার নজির রয়েছে।

 

দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যা ও বলপূর্বক অন্তর্ধান (গুম) এর নানা ঘটনা ঘটেছে [1]। ২০০৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ২৭৫৭ টি ঘটনার অভিযোগ পাওয়া যায়। এই ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাতীয় নির্বাচনের অব্যবহিত আগে ও পরের বছরগুলোতে বিচার বহির্ভূত হত্যার ঘটনা বেড়ে যায়। ২০১৪ এর জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে ২০১৩ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যা ছিল ৩২৯, এর আগের বছর ২০১২তে যা ছিলো ৭০টি। ২০১৮ তে এসেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এসে দাঁড়ায় ৪৬৬ টিতে, ২০১৭তে এর সংখ্যা ছিলো ১৫৫ (দেখুন টেবিল-১)।

 

টেবিল-১: বাংলাদেশে কার বিরুদ্ধে কতগুলো বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ (২০০৮-২০২১)

 

সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে বা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত থাকার কথিত অভিযোগে গুম বা বলপূর্বক অন্তর্ধান ও নিয়ম বহির্ভূতভাবে আটকে রাখার ঘটনার কথা জানা যায় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছ থেকে। ২০০৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ৬০৫ জনকে এ ধরনের ঘটনার শিকার হতে হয় (দেখুন টেবিল-২)। এর মধ্যে কাউকে দীর্ঘদিন আটকে রাখার পরে শর্তসাপেক্ষে ছেড়ে দেয়া হয়, কাউকে আদালতে হাজির করা হয়, কেউ মৃত্যুবরণ করেন, অনেকে এখনো বলপূর্বক অন্তর্ধানের শিকার। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কমপক্ষে ৮৬টি ঘটনার কথা নিশ্চিত করেছে, যাদের কোনো খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি।[2] সম্প্রতি সুইডেনভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম নেত্রনিউজের "আয়নাঘর" নামের একটি তথ্যচিত্রে দুইজন গুমের শিকার তাদের দীর্ঘদিন নিয়ম-বহির্ভূতভাবে আটকে রাখার ও নির্যাতিত হবার ঘটনার বর্ণনা দেন।[3]

 

টেবিল-২: বলপূর্বক অন্তর্ধানের অভিযোগ (২০০৯-২০২১)

 

 

গত ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ সফর শেষে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল বাচেলেট বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর একটি নিরপেক্ষ, স্বাধীন, এবং স্বচ্ছ তদন্তের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন।[4] মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিশেষ করে বলপূর্বক অন্তর্ধান বা গুমের কারণে নানাভাবে সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ সরকার। যুক্তরাষ্ট্র জারি করেছে নিষেধাজ্ঞা।[5] এ ধরনের সমালোচনা, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর চাপ, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নজরদারির মধ্যেও কেন গুমের ঘটনা ঘটে? এ ধরণের গুমের ঘটনার পেছনে যুক্তি কী, কী ধরনের রাজনীতি কাজ করে, এবং গুমের ফলে সমাজ ও গুমের শিকার পরিবার কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, তা এই লেখায় আলোচনা করা হবে।

 

গুমের রাজনীতি: যুক্তি ও উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ

 

গুম মোটেও কোনো নতুন ধরনের অপরাধ নয়। বিশেষ করে ফরাসিরা ইন্দো-চীন ও আলজেরিয়ায় গুমকে নানাভাবে ব্যবহার করেছে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য।  আলজিয়ার্সের যুদ্ধে কমপক্ষে ৩০০০ জনকে গুম করা হয়। এ ধরনের গুমের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও আদর্শগত কারণকে ব্যবহার করা হয়। যেমন ফরাসিরা তাদের উপনিবেশ রক্ষার লড়াইকে ইউরোপ ও খৃস্টান ধর্মের সাথে সমাজতন্ত্র ও উপনিবেশ-বিরোধীদের লড়াই হিসেবে অবহিত করে। এর ফলে ধর্ম ও আদর্শের মোড়কে গুমের মত অপরাধকে জায়েজ করে ফেলা হয়। সন্ত্রাস-বিরোধী লড়াইকে আইনের উর্ধ্বে তুলে ফেলার এই প্রক্রিয়া এখনো বারবার আমরা দেখতে পাই। যুক্তরাষ্ট্র সে সময় ভিয়েতনামে, সাম্প্রতিক সময়ে ইরাক ও আফগানিস্তানে বিচার বহির্ভূত নানা নীতি নেয়। যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের নিপীড়নমূলক নীতি বাইরের দেশে ব্যবহার করে, তা লাতিন আমেরিকান দেশগুলো শুরু করে নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধে।

 

ফরাসিরা তাদের উপনিবেশ রক্ষার লড়াইকে ইউরোপ ও খৃস্টান ধর্মের সাথে সমাজতন্ত্র ও উপনিবেশ-বিরোধীদের লড়াই হিসেবে অবহিত করে। এর ফলে ধর্ম ও আদর্শের মোড়কে গুমের মত অপরাধকে জায়েজ করে ফেলা হয়। সন্ত্রাস-বিরোধী লড়াইকে আইনের উর্ধ্বে তুলে ফেলার এই প্রক্রিয়া এখনো বারবার আমরা দেখতে পাই। যুক্তরাষ্ট্র সে সময় ভিয়েতনামে, সাম্প্রতিক সময়ে ইরাক ও আফগানিস্তানে বিচার বহির্ভূত নানা নীতি নেয়। যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের নিপীড়নমূলক নীতি বাইরের দেশে ব্যবহার করে, তা লাতিন আমেরিকান দেশগুলো শুরু করে নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধে।

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো গড়ে উঠতে শুরু করে। ১৯৪৫ থেকে ১৯৭০ এর মধ্যে মানবাধিকার রক্ষায় অবদান রাখতে যেসব সংস্থা গড়ে উঠে এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জাতিসংঘ (১৯৪৫), আন্তর্জাতিক ন্যুরেমবার্গ সামরিক ট্রাইবুনাল (১৯৪৫), আমেরিকান ডিক্লারেশন অভ রাইটস এন্ড ডিউটিস অভ ম্যান (১৯৪৮), মানবাধিকার এর সার্বজনীন ঘোষণা (১৯৪৮),  ইউরোপিয়ান মানবাধিকার আদালত (১৯৫৯), এবং বেসামরিক ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক কভেন্যান্ট (১৯৬৬)।

 

রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘটিত অপরাধকে এর আগে যেখানে কোনো দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখা হতো, এসব আন্তর্জাতিক সংস্থার উত্থান পরিস্থিতি পাল্টিয়ে দেয়। এর ফলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশেষায়িত ও প্যারামিলিটারি বাহিনী খোলাখুলি সহিংস আচরণ করতে গিয়ে নানা চাপের মুখে পড়া শুরু করে। এর ফলে তারা নির্যাতনের এমন উপায় খোঁজা শুরু করে যার দায় অস্বীকার করা যায়। এর আগে স্বৈরাচারী সরকারগুলো ডিটেনশন সেন্টার, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, ম্যাস ডিপোর্টেশন ইত্যাদি দৃশ্যমান ব্যবস্থার মাধ্যমে বিরোধী মত দমন করত।

 

রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ও সহজে চিহ্নিত করা যায় এমন সহিংস অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যত সোচ্চার হওয়া শুরু করে, নির্যাতনমূলক রাষ্ট্রগুলো ততই দায়বিহীন নির্যাতনের কৌশল হিসেবে গুমকে বেছে নেয়।

 

রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ও সহজে চিহ্নিত করা যায় এমন সহিংস অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যত সোচ্চার হওয়া শুরু করে, নির্যাতনমূলক রাষ্ট্রগুলো ততই দায়বিহীন নির্যাতনের কৌশল হিসেবে গুমকে বেছে নেয়।

 

তাই, ১৯৭০ সালের পর থেকেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুমের প্রতি কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর আগ্রহ বাড়া শুরু করে। গুমের মাধ্যমে শুধু বিরোধী দলকে নয়, নিজের দল বা গোত্রের (ইন-গ্রুপ) প্রতিও বার্তা দেয়া হয় এবং নিজেদের লোকদের বিরোধীদের সাথে সমঝোতাকে প্রতিরোধ করা যায়। [6]

 

কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী সরকারগুলো বিভিন্ন প্রকারে নির্যাতন এর উপায় খুঁজে এর লাভ-ক্ষতি বিবেচনা করেই। নির্যাতন এর নীতি গ্রহণ করার সময় এর সাথে রাজনৈতিক নেতাদের লাভ এবং অন্য নির্যাতন এর সাথে তুলনামূলক বিবেচনা করা হয় ।[7] নিপীড়ন নীতি গ্রহণ করার সময় কৌশলগত নানা বিষয় বিবেচনা রাখা হয়, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পদক্ষেপ (নেমিং এন্ড শেমিং) কী হবে এবং তার মোকাবেলা কিভাবে করা যেতে পারে এ বিষয়টি এখানে উল্লেখযোগ্য।[8] একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যখন আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশেষ করে জাতিসংঘ, কোনো দেশকে দৃশ্যমান নির্যাতনের জন্য তীব্র নিন্দা করেছে, তার পরে সেখানে গোপনীয় বলপূর্বক অন্তর্ধান বেড়েছে।[9]

 

তাই কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর দৃশ্যমান সহিংস আচরণ ও বিরোধীমত দমনের বিরুদ্ধে সমালোচনার সাথে সাথেই অদৃশ্যমান নিপীড়নগুলোর দিকে নজর রাখাও জরুরি। সমালোচনার সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পরিবর্তন আনা জরুরি। সামরিক শাসিত ও একনায়কতন্ত্রের সরকারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা বোঝা তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু গণতন্ত্রের খোলস পড়া কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর ক্ষেত্রে গুমের মত অদৃশ্যমান অপরাধের রাজনীতির বোঝাপড়া আরো জটিল ও দুরূহ।

 

গুমকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের তিনটি দিক বিশ্লেষণের দাবিদার; গুমের বিরোধীমত নির্মূলের ক্ষমতা; ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে সমাজ নিয়ন্ত্রণ[10]; এবং অস্বীকারের কৌশলে দায়মুক্তি। যেকোনো ধরনের বিরোধিতা নির্মূল করা, বিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধতে না দেয়া, এবং এ ধরনের কাজের হোতাদের ভবিষ্যতে রক্ষা করার জন্য গুমকে ব্যবহার করা হয়। সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যেসব সামরিক জান্তা সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে তারা সাধারণত ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিকের অনিশ্চয়তা ও স্বচ্ছতার অভাবের মধ্যে গুমকে ব্যবহার করে বিরোধীমতের প্রধান ব্যক্তিদের দমন করে। পরবর্তীতে ক্ষমতা কাঠামোর উপর ঠিকমতো দখল নেবার পরে নিজেদের বৈধতা ও সরকারী প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণের দিকে তারা নজর দেয়।

 

গণতন্ত্রের খোলস পড়া কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে ও বিরোধী আন্দোলনকে দমন করতে গুমকে ব্যবহার করে। এ কারণে এসব দেশে জাতীয় নির্বাচনকালীন নানা অজুহাতে বিচার বহির্ভূত হত্যা ও গুমের ঘটনা বেড়ে যায়। নির্বাচনের সময় ও পরে সরকারের বিরোধীদের সাথে অনানু্ষ্ঠানিক সমঝোতা, গৃহপালিত বিরোধীদল তৈরি, ও বিরোধিতা বশীকরণে গুমের ভয় কাজে দেয়।

 

গণতন্ত্রের খোলস পড়া কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে ও বিরোধী আন্দোলনকে দমন করতে গুমকে ব্যবহার করে। এ কারণে এসব দেশে জাতীয় নির্বাচনকালীন নানা অজুহাতে বিচার বহির্ভূত হত্যা ও গুমের ঘটনা বেড়ে যায়। নির্বাচনের সময় ও পরে সরকারের বিরোধীদের সাথে অনানু্ষ্ঠানিক সমঝোতা, গৃহপালিত বিরোধীদল তৈরি, ও বিরোধিতা বশীকরণে গুমের ভয় কাজে দেয়।

 

সমাজে জনগণের ম্যান্ডেট বিহীন সরকারের শক্তিশালী অবস্থান তৈরিতে গুম ভূমিকা রাখে। আর্জেন্টিনা ও চিলিতে দেখা যায়, গুমের আতঙ্ক সম্ভাব্য বিরোধী আন্দোলন ঠেকাতে ভূমিকা রেখেছিল। গুম এর মাধ্যমে বিরোধীপক্ষকে "নির্দিষ্টকরণ" করা যায়। তার মানে গুম ঢালাওভাবে ব্যবহৃত অন্যান্য নিপীড়ন পদ্ধতির মত নয়। ঢালাওভাবে সহিংসতা ব্যবহার করলে সরকারের বিরুদ্ধে এবং সরকারবিরোধীদের পক্ষে জনমত তৈরিতে সাহায্য করে। কিন্তু গুম নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা খুব ছোট কোন গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবহার করলে তা বড় ধরনের সরকারবিরোধী জনমত তৈরি করে না। গুমের সাথে সংশ্লিষ্টকে, দায়ীকে ইত্যাদি নিয়ে ধোঁয়াশা থাকার কারণে খুব সহজেই এর দায় এড়ানো যায়। বলা যায় অন্য কোনো কারণে তাদের অন্তর্ধান হয়েছে বা বিদেশ পাড়ি দিয়েছে।

 

গুমের সমাজের উপর একটি বৃহৎ মনস্তাত্বিক প্রভাবও রয়েছে। কাউকে গুম করে বছরের পর বছর আটকে রেখে অথবা তার লাশ নিশ্চিহ্ন করার কারণে কোনো অপরাধ যে আসলে ঘটেছে তা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই অনিশ্চিয়তা সমাজে একটি বড় ধরনের ভীতির সৃষ্টি করে। তাই গুম সমাজে সরকারের নীতি বিরোধী আন্দোলনকে বাধা দিতে অথবা সরকার ব্যর্থতাজনিত নাজুক সময়ে জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। 

 

গুম বা বলপূর্বক অন্তর্ধান সম্পন্ন করার জন্য একটি সুসংগঠিত কাঠামোর দরকার পড়ে। শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো বিশেষ অংশ নয়, এর সাথে সরকারের বিভিন্ন অংশ ও পর্যায়ের বোঝাপড়া, অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং ইন্টিলিজেন্স দরকার। 

 

গুমের নীতি গ্রহণ একটি সময় সাপেক্ষ, ব্যয়সাপেক্ষ উদ্যোগ। যে কারণেই বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী, বিশেষ এলিট বাহিনী, প্যারা-মিলিটারি বাহিনী এই কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়।

 

গুমের নীতি গ্রহণ একটি সময় সাপেক্ষ, ব্যয়সাপেক্ষ উদ্যোগ। যে কারণেই বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী, বিশেষ এলিট বাহিনী, প্যারা-মিলিটারি বাহিনী এই কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়।

 

বিশেষ করে "ডিনাইবেলিটি" বা অস্বীকারের কৌশল গুমের রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে এবং এর সাথে জড়িতদেরও অনেক ক্ষেত্রে দায়মুক্তির নিশ্চয়তা দেয়। ভবিষ্যতের জবাবদিহিতার ভয় এবং আন্তর্জাতিক নজরদারি অনেক সময় কর্তৃত্ববাদী সরকারের উদ্বেগের কারণ হয়। বিশেষ করে যেসব দেশ বাণিজ্যিক ও সামরিকভাবে অন্য দেশের উপর নির্ভরশীল তাদের জন্য এটি বেশি প্রযোজ্য। এর কারণে কর্তৃত্ববাদী সরকার দৃশ্যমান নিপীড়ন এর বদলে গুমের মত গোপন কৌশল নিয়ে দেশের ভেতরের বিরোধী মতকে দমন করে। তাই ভবিষ্যতে কী হবে সেই অনিশ্চয়তা এবং বিচারের মুখোমুখি হবার আশঙ্কায় কর্তৃত্ববাদী সরকার গোপনীয় বলপূর্বক অন্তর্ধানকে বেছে নেয়। 

 

পরিবার ও ফিরে আসা ব্যক্তির উপর গুমের প্রভাব

 

গুমের মনস্তাত্বিক প্রভাব এর রাজনীতির সাথে ওতপ্রতভাবে জড়িত। গুমের শিকার ব্যক্তির "শরীরের বা অস্তিত্বের অনুপস্থিতি" বিভিন্নভাবে সমাজ ও পরিবারকে প্রভাবিত করে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের সাথে সাথে তাদের পরিবারও একটি দীর্ঘকালীন শাস্তির মধ্যে বসবাস করেন। জাতিসংঘের বলপূর্বক অন্তর্ধানের শিকার সব ব্যক্তিকে রক্ষা কনভেনশন (২০০৬)  গুমকে “মানবতা বিরোধী অপরাধ” বলেছে। এই কনভেনশনের আর্টিকেল ২৪ অনুযায়ী গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবারও এই অপরাধের ভিক্টিম হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

গুমের শিকার ব্যক্তিদের "অ্যাবসেন্স অভ বডি" শোকেরও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। গুম উপস্থিতি-অনুপস্থিতি, জীবন-মরণের মধ্যে একটি শূন্য ও বিষাদগ্রস্থ জায়গা তৈরি করে, যার বেদনা অবর্ণনীয়। ২০১৩ সালে গুমের শিকার সাজেদুল ইসলামের মেয়ে ২০ আগস্ট ২০২২ এ একটি মানববন্ধনে বলেন:

 

"আমার বাবাকে যদি মেরে ফেলে থাকেন, তাহলে লাশটা একটু দেখতে দিন। আমি আমার বাবার লাশটা দেখতে চাই। আমি বাবাকে শেষবারের মতো একটু ছুঁয়ে দেখতে চাই।"[11]

 

শোক আর বেদনার সাথে সাথে তা প্রকাশের অনিশ্চয়তা, আশা-নিরাশার দোলাচাল লক্ষ্য করা যায় নাসিমা আকতার স্মৃতির কথায়ও। গুমের শিকার ইসমাইল হোসেন বাতেনের স্ত্রী ঢাকার প্রেস ক্লাবে একটি অনুষ্ঠানে বলেন:

 

"আমাদের চোখের পানি নিয়ে এমপি-মন্ত্রীরা  উপহাস করে, হাসে। তারা বলে আমাদের স্বামীরা বিয়ে করে অন্য কোথাও চলে গেছেন। দেশে নাকি গুম নেই।..আমার বাচ্চারা জিজ্ঞেস করে, সবার তো বাবা আছে আমাদের বাবা নেই কেন। আমি উত্তর দিতে পারি না। আমার স্বামীকে মেরে ফেললে তার মরদেহটা দেন, আমরা মাটি দেব। আমরা একটু মিলাদ পড়াতে চাই। আর বেঁচে থাকলে সেই তথ্যটা আমাদের দেন তিনি কোথায় আছেন।"[12]

 

তথ্যের এই অভাব অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গোপন রাখার কারণে সমাজে অনিশ্চয়তা আরো বাড়ে, ভয়ের সংস্কৃতি আরো শক্তিশালি হয়।

 

গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্য নানা ধরণের শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা ও সমাজে নানা বাধার মুখে পড়েন। স্বজন হারানোর বেদনা, ট্রমা, নিজে বেঁচে থাকার অপরাধবোধ, প্রিয়জনকে বাঁচাতে না পারার অপরাধবোধ, অসহায়ত্ব, হতাশা, গ্লানিবোধ, পিটিএসডি (পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার) ইত্যাদি নিয়ে বেঁচে থাকেন, অপেক্ষা করেন স্বজনরা। ফিরে আসা ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত হুমকি, একাকীত্ব, পারিবারিক বিচ্ছেদ সহ মানসিক নানা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হন। সমাজে তাদের অসহায়ত্ব ও বেদনা অন্যদের জন্য আতংকভরা উদাহরণ হিসেবে থেকে যায়।

 

গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্য নানা ধরণের শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা ও সমাজে নানা বাধার মুখে পড়েন। স্বজন হারানোর বেদনা, ট্রমা, নিজে বেঁচে থাকার অপরাধবোধ, প্রিয়জনকে বাঁচাতে না পারার অপরাধবোধ, অসহায়ত্ব, হতাশা, গ্লানিবোধ, পিটিএসডি (পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার) ইত্যাদি নিয়ে বেঁচে থাকেন, অপেক্ষা করেন স্বজনরা। ফিরে আসা ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত হুমকি, একাকীত্ব, পারিবারিক বিচ্ছেদ সহ মানসিক নানা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হন। সমাজে তাদের অসহায়ত্ব ও বেদনা অন্যদের জন্য আতংকভরা উদাহরণ হিসেবে থেকে যায়।

 

উপসংহার

 

এই প্রবন্ধে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং গুমের রাজনীতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। গুম সাধারণত: তিনটি উদ্দেশ্যে কর্তৃত্ববাদী সরকার করে থাকে। প্রথম, কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী সরকার যাদের নিজের ক্ষমতায় টিকে থাকার পেছনে বড় ধরণের বাধা মনে করে তাদের কৌশলগতভাবে  নির্মূল করা। দ্বিতীয়, এর মাধ্যমে সহিংসতার একটি নতুন ধরণ তৈরি করা, যাতে ভিক্টিমের পরিবার ও সমাজ একটি অনিশ্চিত বেদনার মধ্যে থাকে এবং সামগ্রিক সমাজব্যবস্থায় একটি ভয়ের অচলাবস্থা তৈরি হয়। তৃতীয়, ভিক্টিমকে অপহরণ করে, আটকে রেখে, কিছু ক্ষেত্রে হত্যা করে তাদের অস্তিত্বকে বিলীন করে দেয়া, আর এর মাধ্যমে এই অপরাধকে লুকিয়ে ফেলা। এই প্রক্রিয়ায় কৃত অপরাধকে কর্তৃত্ববাদী সরকার অস্বীকার করতে চায় এবং এই অপরাধের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা পাবে বলে মনে করে। যদিও এ ধরণের মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে দেশে দেশে অনেক কর্তৃত্ববাদী সরকার ক্ষমতা হারানোর পরে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার নজির রয়েছে।

যদিও গুম গোপনীয় রাষ্ট্রীয় অপরাধের একটি ধরন, বর্তমানে গুমের ঘটনাকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, সাংবাদিক ও সামাজিক মাধ্যমের কারণে গুমের ঘটনাগুলো সামনে চলে আসে। কিন্তু এই অপরাধের গোপনীয় প্রকৃতির কারণে সরকারের নীতি-নির্ধারকরা এর দায় অস্বীকার করেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাথেসাথে জাতিসংঘ নির্যাতন বিরোধী কনভেনশন (১৯৮৪), বলপূর্বক অন্তর্ধান এর বিরুদ্ধে জাতিসংঘের ঘোষণা, কনভেনশন ও জোট (১৯৯২, ২০০৬, ও ২০০৭) গুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার।

 

কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে দেশের ভেতরে সরকারের জবাবদিহিতা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু থাকা, সুষ্ঠু নির্বাচন, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ও স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া শুধু বিদেশী চাপে গুমসহ অন্যান্য বিচার-বহির্ভুত মানবাধিকার লঙ্ঘন নিরসন করা সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যারা প্রধানত শিকার হচ্ছেন, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা, তারা নিজেরাই ক্ষমতা থাকাকালীন মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন। তাই নিজেদের স্বার্থেই গুমসহ অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার সদিচ্ছা এবং শুধু বিরোধী দল নয়, সরকারী দলে গিয়েও সেই সদিচ্ছা বজায় রাখা উচিত।

 

জাতীয় পর্যায়ে দেশের ভেতরে সরকারের জবাবদিহিতা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু থাকা, সুষ্ঠু নির্বাচন, শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, ও স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া শুধু বিদেশী চাপে গুমসহ অন্যান্য বিচার-বহির্ভুত মানবাধিকার লঙ্ঘন নিরসন করা সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যারা প্রধানত শিকার হচ্ছেন, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা, তারা নিজেরাই ক্ষমতা থাকাকালীন মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন। তাই নিজেদের স্বার্থেই গুমসহ অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার সদিচ্ছা এবং শুধু বিরোধী দল নয়, সরকারী দলে গিয়েও সেই সদিচ্ছা বজায় রাখা উচিত।

 

গুম ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড জায়েয করতে বাংলাদেশের কিছু  তথাকথিত বিদ্বান পশ্চিমাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকে ইঙ্গিত দেন। কিন্তু তারা মনে রাখেন না একটি অপরাধ কখনো আরেকটি অপরাধকে গ্রহণযোগ্য করেনা। জাতিসংঘ ও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা যেমন জরুরি, তেমনি দেশের মধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোও জরুরী।  চিলি, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, উত্তর কোরিয়া থেকে বাংলাদেশ, মানবাধিকারের জন্য যুদ্ধ সার্বজনীন।

 

সাইমুম পারভেজ

লেখক পরিচিতি: বেলজিয়ামের ফ্রাই ইউনিভার্সিটি ব্রাসেলস-এর রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক। 

ইমেইল এড্রেস: [email protected]

 

তথ্যসূত্র:

[1] https://www.hrw.org/world-report/2022/country-chapters/bangladesh; https://www.hrw.org/node/379500/printable/print ; http://odhikar.org/statistics/statistics-on-disappearances/#

[2] https://www.hrw.org/node/379500/printable/print

[3] https://netra.news/2022/secret-prisoners-of-dhaka/?fbclid=IwAR0kWu2lWSFrl_VDgYSMWv2vCniyaji_4XAIPt0J0pI3eE9mho0N0NKt1Rw

[4] https://www.ohchr.org/en/statements/2022/08/un-high-commissioner-human-rights-michelle-bachelet-concludes-her-official-visit

[5]  https://home.treasury.gov/news/press-releases/jy0526?fbclid=IwAR2f271gIns5ixoWb6T9nBEaI4xy4uquuaXPLtoCt6Em7XhtbGgXXhhDiKE    

[6] Kalyvas, Stathis N (2006) The Logic of Violence in Civil War. Cambridge: Cambridge University Press.

[7] Fariss, Christopher J (2014) Respect for Human Rights has Improved Over Time: Modeling the changing

Standard of Accountability in Human Rights Documents. American Political Science Review 108(2):

297–318.

[8] Hafner-Burton, Emily M (2008) Sticks and Stones: Naming and Shaming the Human Rights Enforcement

Problem. International Organization 62(4): 689–716.

[9] DeMeritt, Jacqueline HR, Conrad, Courtenay R. and Fariss, Christopher J. (2014) The Unintended

Consequences of Human Rights Advocacy on State Repression.

 

[10] "বাংলাদেশে ভয়ের সংস্কৃতি নিয়ে জানতে দেখুন,  আলী রীয়াজ (২০২১) ভয়ের সংস্কৃতি : বাংলাদেশে রাষ্ট্র, রাজনীতি সমাজ ও ব্যক্তিজীবন, ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন। "

[11] https://www.prothomalo.com/bangladesh/17dpiuy73u

[12] https://www.thedailystar.net/news/bangladesh/crime-justice/news/mps-ministers-make-fun-our-tears-police-mentally-torture-us-2939591