শনিবার ১৯শে অগ্রহায়ণ ১৪২৯ Saturday 3rd December 2022

শনিবার ১৯শে অগ্রহায়ণ ১৪২৯

Saturday 3rd December 2022

বহুস্বর মতামত

লাক্কাতুরা চা বাগান: আলোর পাশে অন্ধকার

২০২২-০৯-০৩

সৈকত আরিফ

 নয়নাভিরাম লাক্কাতুরা চা বাগান। বোঝাই যাবে না কত নৃশংস একটা বন্দোবস্ত এই সবুজকে টিকিয়ে রাখছে। ছবি: সৈকত আরিফ

 

 

সিলেটে নামতেই এক ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হলো, চায়ের দোকানে আড্ডায় তিনি জানাচ্ছিলেন চা-শ্রমিকদের কী কী সুবিধা দেন বাগান মালিকরা। জানালেন, সপ্তাহ শেষে তাদের  রেশন দেয়া হয়, বাচ্চাদের জন্য রয়েছে স্কুলের সুবিধা, আছে হাসপাতালও। তার কাছে রেশনের পরিমাণ, স্কুল ও হাসপাতালের মান নিয়ে যখন জানতে চাইলাম তিনি তখন পরিস্কার কোন ধারণা দিতে পারলেন না। তবে রেশনের পরিমাণ, স্কুল ও হাসপাতালের মান নিয়ে তিনি যতটুকু জানাতে পেরেছিলেন তাও যে ঠিক না, তা চা-বাগানে সরেজমিনে গিয়েই বুঝতে পারলাম। অবশ্য চা শ্রমিকরা যে খারাপ আছে, সেটা সিলেটের অধিকাংশ মানুষের ধারণাতেই আছে। কিন্তু সেই খারপটা আসলে কত খারাপ, সেটা তাদেরও অধিকাংশ জানেন না।

 

মাত্র শেষ হলো চা শ্রমিকদের ধর্মঘট। একটানা ১৯ দিনের ধর্মঘট শুধু চা বাগানকে নয়, গোটা দেশকেই আলোড়িত করেছিল। আমার সেখানে সর্বশেষবার যাওয়া হয়েছিল এই ধর্মঘটের সূত্রেই। ধর্মঘটের পুরো সময়টাতে মজুরি না পাওয়া শ্রমিকরা প্রায় অভুক্ত আছেন জানতে পেয়ে আমাদের কিছু বন্ধু উদ্যোগ নিয়ে ধর্মঘটী চা শ্রমিকদের অভুক্ত কিছু পরিবারের জন্য কয়েকদিনের খাবারের বন্দোবস্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেই কাজেই যাওয়া হলো লাক্কাতুরা বাগানে, যেখানে মাটির বুকেই বেহেশত আর দোজখ যেন একদম পাশাপাশি অবস্থান করে।

 

লাক্কাতুরা বাজার থেকে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেটি স্টেডিয়ামের দিকে যেতেই ডানদিকে মনোরম চা-বাগান। অনেক আগে যখন এখানে আন্তর্জাতিক খেলা হতো তখন খেলার মাঝেই টিভিতে ডানদিকের সেই মনোরম চা-বাগানের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখানো হতো, খানিকটা দর্শকদের প্রশান্তি দেয়ার জন্য, খানিকটা হযতো পর্যটনের বিজ্ঞাপন হিসেবেই। কিন্তু মাঠের বামদিকের অংশটুকু কখনো দেখানো হতো না। এই চা বাগানের সাজানো গোছানো সৌন্দর্য কিংবা রফতানি মুখী চা পাতার যে অর্থকরী আলো, তার আড়লে পরে থাকা বামদিকটাতে লাক্কাতুরা চা-বাগানের ১২০ টাকা মজুরীর জীর্ণ-শীর্ণ শ্রমিকদের বসবাস। আমরা যখন সেখানে পৌঁছালাম তখন বেলা ১২টা।

 

তিথি আপা স্থানীয় একটা বিদ্যালয়ে পড়ান। বাগানের সবার কাছে তিনি উষা আপা নামে পরিচিত। চা-শ্রমিকদের সন্তানদের নিয়ে ছোট পরিসরে একটা স্কুল পরিচালনা করেন তিনি। উষা হচ্ছে সেই স্কুলের নাম। আমরা তার সাথে সেই স্কুলটাতে গেলাম। চা শ্রমিকদের তখন ধর্মঘট চলছিল। ফলে পাঠদানের মাঝেই এটা-সেটা আলাপে শ্রমিকদের বিষয় আশয়ও উঠে এলো। আলাপে এসে যুক্ত হলেন চা-শ্রমিক মনিকা, এমসি কলেজের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী জেনি, সাথে ব্রাক স্কুলের সাবেক শিক্ষক সবিতা রাণী।

 

চা-শ্রমিক মনিকা লাক্কাতুরা চা-বাগানে কাজ করেন। তার স্বামী চা-বাগানে কাজ করতেন, তিনি মারা যাবার পর মনিকা স্থায়ী শ্রমিক হিসেবে বাগানে কাজ শুরু করেন। নিরক্ষর মনিকা টাকা গুনতে পারেন না। তার এক সন্তান চা-বাগানে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, মেয়েটি দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এক পরিবার থেকে একজনের বেশি শ্রমিককে স্থায়ী করা হয় না।

 

তিনি জানালেন, ২৩ কেজি চা পাতা তুললে তাদের ১২০ টাকা মজুরি দেয়া হয়। কোনদিন এর থেকে দু-তিন কেজি কম হলেই সেই মজুরি নেমে যায় ৭০-৮০ টাকায়। এছাড়া আছে নানান চাঁদা, পুজোআর্চার খরচ। সেগুলোর জন্যও প্রতি সপ্তাহে শ্রমিকদের হাজিরা থেকে ১০-২০ টাকা কাটা হয়। মজুরি থেকে বাড়ি ভাড়া, প্রফিডেন্ট ফান্ড ও শ্রমিক ইউনিয়নের টাকাও কেটে রাখা হয়। তবে কোন খাতে কতো টাকা কাটা হয়, তার হিসাব ঠিকঠাক জানেন না সাধারণ শ্রমিকরা।

 

 

২৩ কেজি চা পাতা তুললে তাদের ১২০ টাকা মজুরি দেয়া হয়। কোনদিন এর থেকে দু-তিন কেজি কম হলেই সেই মজুরি নেমে যায় ৭০-৮০ টাকায়। এছাড়া আছে নানান চাঁদা, পুজোআর্চার খরচ। সেগুলোর জন্যও প্রতি সপ্তাহে শ্রমিকদের হাজিরা থেকে ১০-২০ টাকা কাটা হয়। মজুরি থেকে বাড়ি ভাড়া, প্রফিডেন্ট ফান্ড ও শ্রমিক ইউনিয়নের টাকাও কেটে রাখা হয়। তবে কোন খাতে কতো টাকা কাটা হয়, তার হিসাব ঠিকঠাক জানেন না সাধারণ শ্রমিকরা।

 

 

বাগানে শ্রমিক বঞ্চনার অনেক হিসাব সহজ করে বুঝিয়ে দিলেন এমসি কলেজের শিক্ষার্থী জেনি। জেনির দাদা ছিলেন চা-বাচা-বাগানের শ্রমিকদের সর্দার। চার-ভাই বোন তারা। তার বাবা চা-শ্রমিক না হয়ে স্বাধীন ব্যবসা শুরু করেছিলেন, দিয়েছিলেন সিএনজির ওয়ার্কশপ। কিন্তু বিধিবাম, গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে সবকিছু বিক্রি করে দিতে হয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর জেনির বড় ভাই আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। কিন্তু জেনি করেছেন। চা-বাগানেই একটা এনজিও স্কুলে চাকরি করেছেন, তাছাড়া পড়িয়েছেন চা-বাগানের শিশুদের। চা-শ্রমিকরা সাধ্যানুযায়ী পারিশ্রমিক দিয়েছেন তাকে। জেনি জানালেন, বেতনের জন্য শ্রমিকদের কখনো চাপাচাপি করেননি, নিজে চা-শ্রমিকের সন্তান হবার কারণেই তার ছাত্রদের পিতামাতার হাড়ির খবর তো তার জানাই।

 

 

লাক্কাতুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়।প্রায় আড়াইশো শিক্ষার্থী পড়ে এই ছোট্ট ঘরটিতে। ছবি: সৈকত আরিফ

 

 

বাগানের প্রাথমিক স্কুল লাক্কাতুরা প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ে নানান প্রশ্ন করেছিলাম জেনির কাছে। পরে যখন সেই স্কুলটা দেখলাম, চা শ্রমিকের সন্তানেরা কেন এত কম সংখ্যায় উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত আসতে পারেন, তা বুঝতে পারলাম। স্কুলটা আসলে ছোট্ট একটা মাত্র কামরার একটা ঘর। সেটাও নির্মাণ করা হয়েছে ইউনিসেফের সহায়তায়। সেটাকে আসলে স্কুল বলাটা কঠিনই। জেনি জানালেন দুইজন শিক্ষক পড়ান সেখানে, বাগানের শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় অড়াইশ। এই রকম অপ্রতুল সুযোগ সুবিধার কারণে অল্প কিছু শিক্ষার্থীই পরের স্তর পর্যন্ত উঠতে পারে। পিতামাতার আগ্রহ যতই থাকুক, তাদের দারিদ্রের চাপও শিশুদের পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকার পেছনে ভূমিকা রাখে। অভুক্ত শিশুরা পড়াশোনায় আগ্রহ পায় না ততটা। লাক্কাতুরা চা-বাগনের পাশেই সিলেট উচ্চ বিদ্যালয়, এই স্কুল চা-শ্রমিকের বাচ্চাদের আলাদাভাবে সুযোগ দেয়া হবে বলেই করা হয়েছিলো। বলা হয়েছিলো কোটা থাকবে ২৫ শতাংশ। বাস্তবে এই উচ্চ বিদ্যালয়ে বাগানের বাইরের শিশুরাই বেশি পড়েন। চা বাগানের সন্তানদের জন্য যে কোটা রাখা হয়েছিলো, সেটা ফাঁকা থেকে যায় প্রাথমিকের গণ্ডিই  খুব বেশি শিক্ষার্থী ডিঙাতে পারেন না বলে।

 

জেনির সাথে কথা হচ্ছিলো তার নিজের শিক্ষ জীবন নিয়ে।  জেনি জানালেন, চা-বাগানের শিশু হবার কারণেই “মূলধারার“ জনগোষ্ঠীর কারো সাথে তেমন বন্ধুত্ব হয়নি তার। স্কুলে চা-বাগানের শিক্ষার্থীদের অনেকেই “কুলি” বলে সম্বোধন করতেন বলেও জানালেন তিনি। তবে কলেজে পড়ার সময় পরিবেশ কিছুটা ভালো পেয়েছেন তিনি; তারপরও সেখানে তার বন্ধু বলতে যা বোঝায় সেরকম কোন সম্পর্ক হয়নি কারো সাথে।

 

জানতে চেয়েছিলাম, অন্য অনেক পেশার মানুষই এখন জীবিকা বদল করছেন। কেন চা-শ্রমিকরা এত সস্তা মজুরিতে কাজ করেন? কেন তারা পেশা বদল করছেন না? তিনি জানালেন, যদি চা-বাগানের কাজ ছাড়তে হয় তাদের তাহলে কোম্পানির দেয়া মাথা গুজবার আশ্রয়টাও ছাড়তে হবে। এটিই পেশা বদলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাঁধা। তাছাড়া, সাংস্কৃতিক ভিন্নতার কারণেই চা-বাগানের শ্রমিকদেরকে বাগানের বাইরে কাজে নিতেও চান না অনেকে।  

 

 

জানতে চেয়েছিলাম, অন্য অনেক পেশার মানুষই এখন জীবিকা বদল করছেন। কেন চা-শ্রমিকরা এত সস্তা মজুরিতে কাজ করেন? কেন তারা পেশা বদল করছেন না? তিনি জানালেন, যদি চা-বাগানের কাজ ছাড়তে হয় তাদের তাহলে কোম্পানির দেয়া মাথা গুজবার আশ্রয়টাও ছাড়তে হবে। এটিই পেশা বদলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাঁধা। তাছাড়া, সাংস্কৃতিক ভিন্নতার কারণেই চা-বাগানের শ্রমিকদেরকে বাগানের বাইরে কাজে নিতেও চান না অনেকে।  

 

 

চা-শ্রমিকের মজুরি ও রেশন নিয়ে কথা বললেন জেনি। জানালেন, সপ্তাহ শেষে শ্রমিকদের আড়াই কেজি আটা দেয়া হয়। শ্রমিকরা আটা দিয়ে রুটি বানিয়ে খান। জেনি একটা অবাক করা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানালেন চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিয়ে। চা-শ্রমিকরা চা-বাগান থেকে কিছু পাতা নিয়ে এসে সেটা শুকিয়ে লবণ ও পানি দিয়ে সেদ্ধ করে তাতে রুটি ভিজিয়ে খান। স্থানীয়ভাবে “চা-পানি বলা হয় এটাকে, ভাত খাওয়ার ক্ষেত্রেও এটার ব্যবহার হয়। বিপুল পরিমানের লবণযুক্ত এই খাবার গ্রহণের কারণে চা-শ্রমিকদের মাঝে উচ্চরক্তচাপের রোগী বেশ ভালো পরিমানেই আছে বলে জানালেন জেনি। অথচ চা শ্রমিকদের রোগাশোকা দুবলা দেহগুলো দেখলে তাদেরকে বরং নিন্মরক্তচাপের রোগী বলেই মনে হবে। জেনির এই পর্যবেক্ষণ নিয়ে জনস্বাস্থ্যবিদরা আরও গবেষণা ও পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

 

চা শ্রমিক মনিকা ও জেনির সাথে কথা হয়েছিলো তাদের কাজের পরিবেশ নিয়ে। বাগানে শ্রমিকদের পানি খাওয়ানোর দায়িত্বে যারা থাকেন, তারা সংখ্যায় এত কম যে কাজ শুরু হবার কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তারা নানা দিকে ছড়িয়ে থাকা শ্রমিকদের পানি খাওয়াতে চলে যান, ফলে শ্রমিকরা কাজের সময় চাহিদামত পানিও পান না। বাগানে নেই  টয়লেটের ব্যবস্থাও। বাগানের শ্রমিকদের নিয়ে হেলথ ক্যাম্প করেছিলেন সমাজকর্মী মার্জিয়া প্রভা। তিনি জানালেন নারী শ্রমিকরা দীর্ঘসময় প্রস্রাব আটকে রাখায় চা বাগানের নারী শ্রমিকদের গুরুতর শারিরীক সমস্যা দেখা দেয়।

 

বাগানের হাসপাতালে চিকৎসা নিয়েও কথা হলো জেনির সাথে। জানলাম হাসপাতালে নাপা ছাড়া আর কোন কিছু দেয় না, এমনকি স্যালাইনও দেয় না সব সময়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সবিতা রানী, তিনি ব্রাকের স্কুলের সাবেক শিক্ষক। অভিযোগের সুরেই জানালেন, তার স্বামী লাক্কাতুরা চা-বাগানের হেলথ সেন্টারে চাকুরি করেন, কর্তৃপক্ষ নাপা আর স্যালাইন  ছাড়া আর কিছু সরবরাহ করে না ওখানে। ফলে দায়িত্বরতরাও নাপা ও স্যালাইন ছাড়া অন্যকিছু শ্রমিকদের দিতে পারেন না।

 

এরপর আমরা সবাই মিলে আন্দোলনরত শ্রমিকদের মাঝে খাবার সরবরাহ করতে বের হই। তখন দেখা মিললো মালিকদের দেয়া বহুল আলোচিত ঘরগুলোর। একে ঘর বলে! ভাঙাচোরা সব কুটির। জরাজীর্ণ সেগুলোর ছাউনি। এই সব ঘরে গাদাগাদি করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে থাকেন দেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসলটির উৎপাদকরা! এই ঘরের জন্য মজুরির বেশ বড় অঙ্কের একটা টাকা কেটে রাখেন মালিকরা; অন্যদিকে সন্তানের জন্য এই মাথা গুজবার ঠাঁইটুকুর কারণে শ্রমিকরা সহজে পেশা বদলাতে পারেন না।

 

জেনি আগে থেকেই একটা তালিকা  করে রেখেছিলেন, সেই তালিকা অনুযায়ী আমরা তা দিতে থাকলাম। ধর্মঘট করছিলেন বলে তারা সাপ্তাহিক মজুরি পাননি। সঞ্চয় বলে কিছু ছিল না বলে তাদের প্রায় কারো ঘরেই ভাত ছিল না। চালভাজা খেয়ে টিকে ছিলেন বহু শ্রমিক। বন থেকে জোগাড় করা কচুঘেচু ছিল খাবার। খুব ভালো লাগতো ধর্মঘটী শ্রমিকদের জন্য এই সংহতি জানাবার কাজটা আমরা যদি আরও বড় মাত্রায় করতে পারতাম। পৃথিবীর বহু ধর্মঘট সফল হয়েছে তাদের সাথে সংহতি জানানো অন্য পেশাজীবী ও জনগণের সমর্থনে।

 

 

ধর্মঘট করছিলেন বলে তারা সাপ্তাহিক মজুরি পাননি। সঞ্চয় বলে কিছু ছিল না বলে তাদের প্রায় কারো ঘরেই ভাত ছিল না। চালভাজা খেয়ে টিকে ছিলেন বহু শ্রমিক। বন থেকে জোগাড় করা কচুঘেচু ছিল খাবার। খুব ভালো লাগতো ধর্মঘটী শ্রমিকদের জন্য এই সংহতি জানাবার কাজটা আমরা যদি আরও বড় মাত্রায় করতে পারতাম। পৃথিবীর বহু ধর্মঘট সফল হয়েছে তাদের সাথে সংহতি জানানো অন্য পেশাজীবী ও জনগণের সমর্থনে।

 

 

এটা বলতেই হবে যে, যে কোন সংগ্রামের প্রধান চালিকা শক্তি সেখানকার মানুষেরাই। কিন্তু এতেও কোন সন্দেহ নেই যে, পারস্পরিক সংহতি আর মমত্ববোধ গোটা দেশের ওপরই যে জুলুম চেপে আছে, তাকে সরাতে সাহায্য করবে।

 

 

তারাপুর চা বাগানে কোম্পানির দেয়া ঘরের সামনে একটি চা-শ্রমিক পরিবার। ছবি: তমিস্রা তিথি

 

 

পুরো দুটি বাগান আমরা ঘুরে শেষ করেও কোন রাজনৈতিক দলের বা কোন ইউনিয়নের পোস্টার চোখে পড়েনি আমার। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কোন পোস্টার ছাড়া আর কিছুই নেই। সিলেট শহরের এতকাছের একটা বাগানে কোন রাজনৈতিক দলের পোস্টার না থাকার ব্যাপারটা আমাকে বেশ অবাক করেছে। এমনকি আওয়ামী লীগের কোন পোস্টারও না। যদিও চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নেতরা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করেন। জেনিকে প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি এই বাগানে বড় হয়েছেন, এদের জীবনের সাথে আপনিই মিশে আছেন, কখনো রাজনৈতিকভাবে এই জনগোষ্ঠীর জন্য কোন কিছু করার ইচ্ছা হয়েছে বা অন্য কেউ কি সেই কাজটা করেছেন? জেনি হয়তো এ প্রশ্ন শুনে কিছুটা অবাকই হয়েছেন, তিনি জানালেন বাগানের বাচ্চাদের পড়ানোর বাইরে খুব বেশি কিছু ভাবেন নি। বাগানে কোন রাজনৈতিক কার্যক্রম চোখে না পড়া নিয়ে আলাপ করেছিলাম তমিস্রা তিথির সাথে। তিনি জানালেন বাগানে রাজনৈতিক পোস্টার বা সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় কিছু অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আছে। আর চা-শ্রমিকদের নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাজের পরিকল্পনাও কম বলেও অভিযোগ আছে।

 

চা শ্রমিকদের আন্দোলনের সময় গোয়েন্দা তৎপরতা যেভাবে চালানো হয়েছে তা কল্পনাতীত। পুরো প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা এবং চা শ্রমিক ইউনিয়ন সাধ্যমত চেষ্টা করেছে এই আন্দোলনেক দমন করতে। শুধু তাই না, চা শ্রমিকরা যেহেতু প্রথাগতভাবে আওয়ামী লীগের ভোটার বলে ধরে নেয়া হয়, শ্রমিকদের ওপর শুরুতে হুকুম আকারে, শেষে অনুনয় বিনয় এবং হুমকি আকারে প্রধানমন্ত্রীর ওপর আস্থা রাখার নির্দেশ ছিল। তবে এই নির্দেশ খুব কাজ করেনি। তবে ক্ষুধার যন্ত্রণায় ধর্মঘটী শ্রমিকরা শেষ পর্যন্ত ১৭০ টাকার মজুরি মেনে নিতে বাধ্য হলেন।  

 

নিরন্ন ধর্মঘটী শ্রমিকরা নিজেরা চাঁদা তুলে কিংবা সহমর্মীদের সহযোগিতায় সামান্য খাবার খেয়ে টিকে ছিলেন। আলোকচিত্র: তমিস্রা তিথি

 

 

সামগ্রিকভাবে বাগানে গিয়ে যা মনে হলো, একটা গোটা জনগোষ্ঠীকে কীভাবে অনেক দীর্ঘসময় ধরে শোষণ করা যায়, তার একটা দূরপরিকল্পনা নিয়েই তারা এই চা-বাগান পরিচালনা করেন। চা-বাগানে এখন যতোটা প্রতিরোধ হচ্ছে, তার পেছনে সর্বশেষ প্রজন্মের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই প্রজন্ম দেশ/দুনিয়া সম্পর্কিত ধারণা আগের প্রজন্মের চেয়ে তুলনামূলকভাবে অনকে ভালো। 

 

 

একটা গোটা জনগোষ্ঠীকে কীভাবে অনেক দীর্ঘসময় ধরে শোষণ করা যায়, তার একটা দূরপরিকল্পনা নিয়েই তারা এই চা-বাগান পরিচালনা করেন। চা-বাগানে এখন যতোটা প্রতিরোধ হচ্ছে, তার পেছনে সর্বশেষ প্রজন্মের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই প্রজন্ম দেশ/দুনিয়া সম্পর্কিত ধারণা আগের প্রজন্মের চেয়ে তুলনামূলকভাবে অনকে ভালো। 

 

 

তাদের নিয়ে চা শ্রমিকদের নতুন সংগঠনও গড়ে উঠেছে, সেটা একটা অত্যন্ত আশার দিক। মজুরি খানিকটা হলেও বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও এই বাড়তি কয়টি টাকা মুদ্রাস্ফীতিই খেয়ে ফেলবে। কিন্তু প্রথাগত শ্রমিকনেতারা যেভাবে শ্রমিকদের মাঝ থেকে আস্থা হারিয়েছেন, সেটা হয়তো চা বাগানে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করবে। উদ্যমী নতুন নেতারা হয়তো শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ওপর নিত্য দিনের শোষণকে প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবেন। বিশেষকরে চা বাগানের নিরক্ষর শ্রমিকদের যেভাবে ওজনে ঠকানো হয়, কারণে অকারণে চাঁদা আদায় করা হয়, সেগুলো নিয়ে তারা কথা তুলবেন। শ্রমিকদের ইউনিয়নের চাঁদার বিপুল টাকা কিভাবে ব্যয় হয়, সেই প্রসঙ্গগুলো তোলাও অত্যন্ত জরুরি।

 

 চা-বাগান শ্রমিকদের মজুরি নতুন প্রজন্মের নেতারা অন্তত ৩০০ টাকা করার দাবি করেছিলেন। চা শ্রমিকরা খেয়ে, না-খেয়েও তাদের সন্তানদের শিক্ষা দিতে চান। এই মজুরি যদি তারা পেতেন তাহলে চা-শ্রমিকদের জীবনমানে ছোট হলেও একটা উলম্ফন ঘটতো। চা-বাগানের মালিকরা যে চক্র তৈরি করেছেন, তা নতুন করে একটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতো। নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠাও আরও শক্তিশালীভাবে হতো। সেটা না হলেও তেমন কিছু সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবারের আন্দোলনে।

 

সরকার প্রধান শুধুমাত্র চা মালিকদের সাথে লোক দেখানো বৈঠক করে শুধুমাত্র  মালিকদের  পক্ষে অবস্থান নিয়ে ১৭০ টাকা মজুরি ঘোষণা করলেন। সাম্প্রতিক বাজারে যেভাবে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়েছে তাতে এই মজুরি বৃদ্ধিতেও শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি বাড়বে কিনা সে প্রশ্নের মিমাংসা হবে আগামী দিনের আন্দোলনে। আপাতত তারা আবার সেই দাসের জীবন-যাপনেই থাকতে বাধ্য হবে।

 

তবে আশার ব্যাপার হলো, এই আন্দোলন যেভাবে সারাদেশকে কাঁপিয়ে দিলো তাতে এই আন্দোলন সামনে আরো শক্তিশালী হবে।  যদি রাজনৈতিক কর্মীরা চা-শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা  নিয়ে; চা শ্রমিকদের জীবনে দাসত্বের অবসান নিয়ে কাজের নতুন নতুন পরিকল্পনা তৈরি করে বাস্তবায়ন করতে পারেন,  সেইটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হবে।

 

 

এই আন্দোলন যেভাবে সারাদেশকে কাঁপিয়ে দিলো তাতে এই আন্দোলন সামনে আরো শক্তিশালী হবে।  যদি রাজনৈতিক কর্মীরা চা-শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা  নিয়ে; চা শ্রমিকদের জীবনে দাসত্বের অবসান নিয়ে কাজের নতুন নতুন পরিকল্পনা তৈরি করে বাস্তবায়ন করতে পারেন,  সেইটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হবে।

 

 

বিশেষকরে অচেনা অজানা এই চা শ্রমিকদের জন্য গোটা দেশের মানুষ যেভাবে সংহতি জানিয়েছেন, তা অবিস্মরণীয়। খুব কম মানুষই তাদের ওপর এই দাসত্বের নিপীড়নের পক্ষে কথা বলেছেন। অধিকাংশ দেশবাসীর ধিক্কার নিয়ে চা বাগানের দাসশ্রম আর কতদিন টিকিয়ে রাখা যাবে, সেটা সামনের দিনের লড়াইয়ে নির্ধারিত হবে।

 

 

সৈকত আরিফ

লেখক, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন।

 

 

আরো পড়ুন

চা শ্রমিকের গান

নেতাদের ভূমিকার সাথে একমত নন চা শ্রমিকরা

গণমাধ্যমে চা শ্রমিক আন্দোলনের উপস্থাপন

'মুল্লুক চলো' আন্দোলনের ১০১ বছর

চা শ্রমিক আন্দোলনে গোয়েন্দা তৎপরতা কেন?

চা শ্রমিক যে কারণে আধুনিক দাস

প্রজন্মান্তরে যেভাবে দাস বানানো হয় চা শ্রমিকদের