শনিবার ১৯শে অগ্রহায়ণ ১৪২৯ Saturday 3rd December 2022

শনিবার ১৯শে অগ্রহায়ণ ১৪২৯

Saturday 3rd December 2022

বহুস্বর মতামত

ওটিটি প্লাটফর্ম ও সামাজিক গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে প্রস্তাবিত আইন বাক স্বাধীনতার লঙ্ঘন

২০২২-১০-২৩

রাইসুল সৌরভ

ফেসবুকে ২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ সন্ত্রাসী হামলার লাইভ স্ট্রিমিং ঘটনা সন্ত্রাসীদের দ্বারা যেকোনও সময় অসৎ উদ্দেশ্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহৃত হতে পারে বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে গেছে। ইন্টারনেটে সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে সন্ত্রাসবাদের প্রচার ও প্রসার করতে সোশ্যাল মিডিয়াকে সন্ত্রাসীরা এখন প্রায় প্রতিনিয়ত কোনও না কোনোভাবে ব্যবহার করছে এবং বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলিতে বিভিন্ন অবৈধ ও ক্ষতিকর আধেয় (কনটেন্ট) ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবল হুমকি তৈরি করেছে।

 

ফলশ্রুতিতে ক্রাইস্টচার্চ ঘটনার নাটের গুরু সন্ত্রাসী ব্রেন্টন ট্যারান্টের আল নূর মসজিদে ৫১ জন মুসলিম উপাসককে হত্যার লাইভ ভিডিও সম্প্রচারের পরপরই দুনিয়াজুড়ে অনলাইনে প্রদর্শনযোগ্য বিষয়বস্তু নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণে আইন তৈরিতে জনমত তীব্র রাজনৈতিক গতি পায়। তার আগে, বৈশ্বিক সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলি সাধারণত তাদের নিজস্ব নীতিমালার মাধ্যমে স্বেচ্ছায় অবৈধ ও ক্ষতিকর আধেয় অপসারণ করত এবং এ কাজে সাধারণত তারা AI প্রযুক্তি ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ব্যবস্থা নিত। তবে ক্রাইস্টচার্চ হামলা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলিকে স্বেচ্ছায় গৃহিত ব্যবস্থা থেকে বাধ্যতামূলক আইনি হস্তক্ষেপে যেতে বাধ্য করেছে।

 

বিশ্বব্যাপী একটি চলমান বিতর্ক রয়েছে যে বিচার বিভাগ নাকি সরকারি কোনও প্রতিষ্ঠান অথবা তৃতীয় একটি পক্ষ হিসাবে বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানি কোনও বিষয়বস্তু বৈধ নাকি অবৈধ তা নির্ধারণ করবে? কারণ দুনিয়াজুড়ে অনলাইন নিরাপত্তা আইনের সাম্প্রতিক প্রবণতা হল বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলির ওপর বিষয়বস্তুর বৈধতা মূল্যায়ন করার ভার অর্পন করা

 

গত কয়েক বছরে বিশ্বব্যাপী ৪০টিরও বেশি নতুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আধেয় নিয়ন্ত্রণ আইন গৃহীত হয়েছে এবং এই মুহূর্তে আরও অন্তত ৩০টি আইন প্রণয়ন বিভিন্ন রাষ্ট্রে সক্রিয়ভাবে বিবেচনাধীন রয়েছে। এই আইনগুলির সাধারণ লক্ষ্য হল অনলাইন সেবাপ্রদানকারীদের তাদের প্ল্যাটফর্মের বিষয়বস্তু সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে আইনগত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা এবং অনলাইনে চরমপন্থা প্রচারে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার রোধ । এই আইনগুলি অবৈধ এবং ক্ষতিকারক কিন্তু সরাসরি অবৈধ নয় এমন উভয় ধরনের আধেয় নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। অবৈধ আধেয় বলতে সকল ধরনের আধেয় যা সরাসরি কোনও আইন লঙ্ঘন করে; যেমনঃ ঘৃণাত্মক বক্তৃতা, সহিংসতার প্ররোচনা, শিশু নির্যাতন, প্রতিশোধ পর্ন প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত করে। অপরদিকে, ক্ষতিকারক আধেয় বলতে এমন সব তথ্যকে বোঝায় যা সরাসরি বা কঠোরভাবে আইনি নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে না; কিন্তু সমাজে এটির যথেষ্ট ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে; যেমন: অনলাইনে আত্ম-ক্ষতি চিত্রিত করা, আত্মহত্যার চেষ্টা তুলে ধরা, সাইবার বুলিং, ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন ইত্যাদি।

 

ক্রাইস্টচার্চের ঘটনার পরপরই অস্ট্রেলিয়ান পার্লামেন্ট ২০১৯ সালের মার্চ মাসেই তাদের the Criminal Code Amendment (Sharing of Abhorrent Violent Material) Act আইন প্রণয়ন করেছিল। এই আইনটি অনলাইন আধেয় ও হোস্টিং পরিষেবা প্রদানকারীদের দায়িত্বশীল ও তাদের স্ব স্ব প্ল্যাটফর্ম নিরাপদ করার  জন্য নতুন অপরাধ এবং দায়বদ্ধতা তৈরি করেছিল। উক্ত আইনটি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলিকে দ্রুত অবৈধ এবং ক্ষতিকারক আধেয় অপসারণ করতে বাধ্যকরী আইনি দায় আরোপ করেছে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (সাধারণত ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টা) আধেয় সরাতে ব্যর্থ হলে কোম্পানির বার্ষিক লাভের ১০% পর্যন্ত জরিমানা ও কারাদণ্ডের ব্যবস্থা রেখেছে। পুনরায় ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়া তার ব্যবহারকারীদের জন্য অনলাইন জগত আরও নিরাপদ করতে নতুন আরও একটি স্বকীয় অনলাইন নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করেছে; যা বিশ্বের মধ্যে প্রথম শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও সাইবার অপব্যবহার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করেছে।

 

এ সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনগুলির বিরুদ্ধে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করার এবং সেন্সরশিপ আরোপের মতো ভয়াবহ অভিযোগ রয়েছে। আদালতকে এড়িয়ে কোনও তৃতীয় পক্ষ কিংবা বর্তমান পদ্ধতিতে সরকারের হুকুম পাওয়া মাত্র কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হওয়াটা বিপদজনক। কেননা এতে বিচারবিভাগের ভূমিকা ছাড়াই কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার মতো ব্যবস্থাগ্রহণের ফলে হয়রানি ও এবং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হবার আশঙ্কা বাড়ে। কার্যত সেটাই এই আইনের লক্ষ্য বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এছাড়া, যথাযথ আইনি সুরক্ষা না থাকলে হোস্টিং সেবাপ্রদানকারী কোম্পানি ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো সরকারের প্রতিহিংসা কিংবা শাস্তি ও আইনি দায়বদ্ধতা এড়াতে বিষয়বস্তুর ক্ষতিকর দিকগুলো প্রকৃতভাবে মূল্যায়ন না করেই সরকারি সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে অভিযোগ পাওয়া মাত্রই বিষয়বস্তু সরিয়ে ফেলতে পারে

 

অনুরূপভাবে; জার্মানি, ফ্রান্স, ইউরোপিয় ইউনিয়ন (ইইউ), তুরস্ক, ব্রাজিল, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিষয়বস্তু (আধেয়) পরিচালনার জন্য অনুরূপ আইনি কাঠামো পাশ করেছে না হয় আইন পাশের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে এসকল আইনের অধীনে বিশ্বব্যাপী একটি চলমান বিতর্ক রয়েছে যে বিচার বিভাগ নাকি সরকারি কোনও প্রতিষ্ঠান অথবা তৃতীয় একটি পক্ষ হিসাবে বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানি কোনও বিষয়বস্তু বৈধ নাকি অবৈধ তা নির্ধারণ করবে? কারণ দুনিয়াজুড়ে অনলাইন নিরাপত্তা আইনের সাম্প্রতিক প্রবণতা হল বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলির ওপর বিষয়বস্তুর বৈধতা মূল্যায়ন করার ভার অর্পন করা। তথাপি এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, আলোচ্য আইনসমূহ বিশাল বিশাল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং তাদের অবৈধ ও ক্ষতিকারক আধেয়ের বিরুদ্ধে নিজস্ব ব্যবস্থা গ্রহণ বিষয়ে স্বচ্ছ বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করতে এবং ব্যবহারকারীদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি পরিপূর্ণ আইনি কাঠামো প্রদান করেছে।

 

তবে একথাও সত্য যে, এ সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনগুলির বিরুদ্ধে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করার এবং সেন্সরশিপ আরোপের মতো ভয়াবহ অভিযোগ রয়েছে। আদালতকে এড়িয়ে কোনও তৃতীয় পক্ষ কিংবা বর্তমান পদ্ধতিতে সরকারের হুকুম পাওয়া মাত্র কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হওয়াটা বিপদজনক। কেননা এতে বিচারবিভাগের ভূমিকা ছাড়াই কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার মতো ব্যবস্থাগ্রহণের ফলে হয়রানি ও এবং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হবার আশঙ্কা বাড়ে। কার্যত সেটাই এই আইনের লক্ষ্য বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এছাড়া, যথাযথ আইনি সুরক্ষা না থাকলে হোস্টিং সেবাপ্রদানকারী কোম্পানি ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো সরকারের প্রতিহিংসা কিংবা শাস্তি ও আইনি দায়বদ্ধতা এড়াতে বিষয়বস্তুর ক্ষতিকর দিকগুলো প্রকৃতভাবে মূল্যায়ন না করেই সরকারি সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে অভিযোগ পাওয়া মাত্রই বিষয়বস্তু সরিয়ে ফেলতে পারে। উপরন্তু, এ দায়িত্বে স্বাধীন বিচার বিভাগকে পাশ কাটিয়ে বেসরকারি প্রযুক্তি সংস্থার অন্তর্ভুক্তকরণ সোশ্যাল মিডিয়াতে ভিন্নমত সীমাবদ্ধ করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

 

বাংলাদেশ মূলত নির্দেশ এবং নিয়ন্ত্রণ (কমান্ড ও কন্ট্রোল) পদ্ধতিতে সোশ্যাল মিডিয়ার অবৈধ ও ক্ষতিকর বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণ করছে। যেখানে সরকার এবং আদালত উভয়ই টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা সংস্থাকে যেকোনও বিতর্কিত (যার কোনও আইনি মানদণ্ড নেই) বিষয়বস্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অপসারণ করতে বা বাংলাদেশ থেকে একটি নির্দিষ্ট লিংকে প্রবেশ করতে বাঁধা দেয়ার নির্দেশনা জারি করে। সুতরাং, এ ভূ-খণ্ডে বেআইনি এবং ক্ষতিকারক বিষয়বস্তু নির্ধারণের জন্য কোনও সুনির্দিষ্ট ও পরিষ্কার মানদণ্ডের অভাবে সংবিধান কর্তৃক রক্ষিত মত প্রকাশের স্বাধীনতা, মতের বহুত্ব এবং ভিন্নমতকে সীমিত করার প্রকৃত ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।

 

বাংলাদেশে ইতিপূর্বে জনপ্রিয় সামাজিক মিডিয়াতে আত্মহত্যার সরাসরি সম্প্রচার, প্রতিশোধ পর্ন প্রকাশ, সাইবার বুলিং থেকে শুরু করে হয়রানি, ঘৃণাত্মক বক্তব্য, অপব্যবহার, সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার তৈরি ইত্যাদির মতো বেআইনি এবং ক্ষতিকারক আধেয় ছড়িয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। এদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা বাড়লেও অদ্যাবধি বেআইনি ও ক্ষতিকর আধেয় নিয়ন্ত্রণে কোনও নির্দিষ্ট আইন করা হয়নি। যদিও সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে কিছু বিতর্কিত আইন; যেমন: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, আইসিটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে; তথাপি সেসকল আইনসমূহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেআইনি ও ক্ষতিকারক বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণের জন্য মোটেই উপযোগী ও যথেষ্ট নয়।

 

এখন, বাংলাদেশ মূলত নির্দেশ এবং নিয়ন্ত্রণ (কমান্ড ও কন্ট্রোল) পদ্ধতিতে সোশ্যাল মিডিয়ার অবৈধ ও ক্ষতিকর বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণ করছে। যেখানে সরকার এবং আদালত উভয়ই টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা সংস্থাকে যেকোনও বিতর্কিত (যার কোনও আইনি মানদণ্ড নেই) বিষয়বস্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অপসারণ করতে বা বাংলাদেশ থেকে একটি নির্দিষ্ট লিংকে প্রবেশ করতে বাঁধা দেয়ার নির্দেশনা জারি করে। সুতরাং, এ ভূ-খণ্ডে বেআইনি এবং ক্ষতিকারক বিষয়বস্তু নির্ধারণের জন্য কোনও সুনির্দিষ্ট ও পরিষ্কার মানদণ্ডের অভাবে সংবিধান কর্তৃক রক্ষিত মত প্রকাশের স্বাধীনতা, মতের বহুত্ব এবং ভিন্নমতকে সীমিত করার প্রকৃত ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।

 

প্রস্তাবিত আইনটির খসড়ায় বার্তা পরিষেবা প্রদানকারীর মতো মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে (যেমনঃ মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ প্রভৃতি) ব্যবহারকারীদের বার্তার গোপনীয়তা উন্মুক্ত করতে এবং বার্তার প্রথম প্রেরককে খুঁজে বের করে তার সম্পর্কে তথ্য দিতে বাধ্য করা হয়েছে, যা নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে নাগরিকের যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, এই খসড়া প্রবিধানের মাধ্যমে বিটিআরসিকে এই ক্ষমতা দেওয়ার মাধ্যমে তার যথেচ্ছ ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উল্লিখিত প্রবিধানের দ্বিতীয় ও তৃতীয়ভাগে আরও বেশ কিছু সুযোগ রয়েছে, যা সংবিধান প্রদত্ত নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং গোপনীয়তার অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন করতে পারে।

 

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) ডিজিটাল, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের আধেয় নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০২১ সালে একটি খসড়া প্রবিধান প্রকাশ করে। যদিও বাংলাদেশের উচ্চ আদালত একটি মামলায় শুধুমাত্র ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য নীতি প্রণয়নের জন্য একটি আদেশ দিয়েছিল; অন্য কোনও মাধ্যমের জন্য নয়। তবে বিটিআরসি কর্তৃক সুপারিশকৃত প্রবিধানের সঙ্গে ভারতের তীব্র সমালোচিত Indian Information Technology (Intermediary Guidelines and Digital Media Ethics Code) Rules, 2021 এর প্রভূত মিল রয়েছে। খসড়া প্রবিধান প্রকাশের পরপরই এটি মত প্রকাশের স্বাধীনতা পরিপন্থী মর্মে অধিকারকর্মী ও বাংলাদেশের সুশীল সমাজ কর্তৃক ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। উক্ত খসড়া প্রবিধানে এমন অনেক অসম্পূর্ণ ও অস্পষ্ট শব্দমালা রয়েছে যেগুলোর কোনও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা প্রবিধানে নেই; যেমনঃ দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা বা নিরাপত্তা, শালীনতা বা নৈতিকতা, বিদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, বা মানহানি। সঠিক ও নির্দিষ্ট সংজ্ঞার অভাব এবং অপরাধ গঠনের উপাদানগুলির অজ্ঞতা মতামত প্রকাশের জন্য একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করবে। কারণ এর আগে এদেশে জনগণকে জেলে পাঠানোর জন্য এই শব্দমালার অযৌক্তিক ব্যবহারের বেশ কয়েকটি অভিযোগ রয়েছে।

 

আবার প্রস্তাবিত আইনটির খসড়ায় বার্তা পরিষেবা প্রদানকারীর মতো মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে (যেমনঃ মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ প্রভৃতি) ব্যবহারকারীদের বার্তার গোপনীয়তা উন্মুক্ত করতে এবং বার্তার প্রথম প্রেরককে খুঁজে বের করে তার সম্পর্কে তথ্য দিতে বাধ্য করা হয়েছে, যা নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে নাগরিকের যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, এই খসড়া প্রবিধানের মাধ্যমে বিটিআরসিকে এই ক্ষমতা দেওয়ার মাধ্যমে তার যথেচ্ছ ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উল্লিখিত প্রবিধানের দ্বিতীয় ও তৃতীয়ভাগে আরও বেশ কিছু সুযোগ রয়েছে, যা সংবিধান প্রদত্ত নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং গোপনীয়তার অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন করতে পারে।

 

তাই, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড, প্রতিষ্ঠিত সর্বোত্তম চর্চা নিশ্চিতকরণ এবং কারও অধিকার লঙ্ঘন না করে দেশবাসীর জন্য নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে সরকারের উচিত নতুনভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আইন তৈরি করা। যাতে মত প্রকাশের স্বাধীনতাও রক্ষা পায় আবার অপরদিকে অনলাইনে অবৈধ ও ক্ষতিকর আধেয় যৌক্তিক ও আইনগতভাবে অপসারণ করা যায়।

 

 

রাইসুল সৌরভ 

আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও গবেষক এবং অধিকারকর্মী।

ইমেইল: [email protected]