“মিডিয়ার চতুর্থ স্তম্ভ হয়ে ওঠা আর আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই”
২০২৬-০১-২৭
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনামলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে শাসন ও নিপীড়নের চিত্রকে বিশ্লেষণ এবং এই গণমাধ্যম শিল্পকে সংস্কারের একটা রূপরেখা অন্তবর্তীকালীন সরকারে উদ্যোগে গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। যে রাজনৈতিক প্রত্যয় নিয়ে সরকার কমিশনটি গ্রহণ করেন, একই রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও মনোযোগ প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। কার্যত প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা ছাড়া সরকারের দিক থেকে এই বিষয়ে আর কোনও উদ্যোগ নেয়া হয় নাই। এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরীফ এর সঙ্গে দৃকনিউজের পক্ষ থেকে মীর হুযাইফা আল মামদূহ গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের রিপোর্টকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? সুপারিশমালাগুলো কী কার্যকর করার মতো করে করা হয়েছে বলে মনে করেন?
সাজ্জাদ শরিফ: এটাকে নানা পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখা যায়। প্রথমত আমি এটাকে ইতিবাচকভাবেই দেখতে চাই। কারণ বাংলাদেশে মিডিয়া নিয়ে কাঠামোগতভাবে খুব একটা ভাবা হয়নি। এখন কেবল একটা মিডিয়া কমিশনের রিপোর্টেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশা আমি করি না। এই রিপোর্টে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এসেছে, আবার অনেক বিষয় বাদও পড়েছে। বিশেষ করে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে— নতুন প্রযুক্তি, সোশ্যাল মিডিয়া, এআই, এই পরিবর্তনগুলো সাংবাদিকতাকে যেভাবে নতুন ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সেগুলো হয়তো আরও গভীরভাবে আলোচিত হতে পারত। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই পরিস্থিতিকে আরও দ্রুত বিপুলভাবে বদলে দেবে। সামনে অভাবিত আরও বহু পরিবর্তন আসবে। বিষয়গুলো নিয়ে সারা বিশ্বই এখনো একটা ভীষণ অস্থিরতার মধ্যে আছে। এই কমিশনের কাছ থেকে তাই খুব পূর্ণাঙ্গ কোনো প্রস্তাব আশা করাও বাস্তবসম্মত নয়।
বাংলাদেশের বিদ্যমান মিডিয়া বাস্তবতায় রিপোর্টে যা বলা হয়েছে, আমি সেটাকে গ্রহণযোগ্য একটি সূচনা হিসেবে দেখি। আমরা তো মিডিয়া হিসেবে অনেক পিছিয়ে আছি। একটি-দুটি প্রতিষ্ঠান চেষ্টা করছে বলা যায়, কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই কাঠামোগতভাবে দুর্বল। এই বাস্তবতায় কমিশনের রিপোর্ট পুরোপুরি অকার্যকর, তা আমি মনে করি না। আরও বেশি ও সুগভীর সুপারিশের কোনো শেষ সীমানা নেই। এটা সত্য যে রিপোর্টে কিছু উচ্চাভিলাষী সুপারিশ আছে। যেমন ক্রস ওনারশিপ নিষিদ্ধ করা। বাস্তবে তো কেউ কেউ এই মালিকানা পেয়েই গেছে। একাধিক মিডিয়ার মালিকানা থাকার ফলে তারা এক ধরনের মিডিয়া–মনোপলির ক্ষমতা অর্জন করেছে। দেশের পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করার ব্যাপক ক্ষমতা তাদের হাতে চলে গেছে। এখন যদি এসব মালিকানার পেছনে দুর্বৃত্তায়িত অর্থ থাকে এবং সেই অর্থ ক্ষমতা–কাঠামোর দুষ্টচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়, তাহলে তাদের দাপট প্রায় সীমাহীন হয়ে ওঠে। এটা একটা বিষাক্ত চক্রের মতো কাজ করে। যাদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক ভালো, তারাই মূলত এ ধরনের মালিকানা পেয়ে এসেছে। সবাই পায়নি। আমি অনেকের কথা বলতে পারি, যারা চেয়েও পায়নি। অর্থাৎ এখানে ক্ষমতার নিজস্ব পছন্দ কাজ করে— কে তাদের লোক, কে তাদের লোক নয়। ফলে সরকার যদি স্বৈরাচারী হয়, যারা মিডিয়ার এ ধরনের মালিকানা পেয়েছে, তারা সেই স্বৈরাচারকে রক্ষা করার চেষ্টা করবে। আর তার বিনিময়ে তাদের একচেটিয়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা সুরক্ষিত থাকে। এখানে একটা স্পষ্ট আদান-প্রদান আছে। এই বাস্তবতায় কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন করতে পারলে অবশ্যই ভালো হতো। প্রশ্ন হলো, যারা এরই মধ্যে এই অবস্থানে আছে, তাদের নিয়ে কী করা হবে? ভবিষ্যতে যে সরকার আসবে, তারা কি সাহসী ও শক্তি নিয়ে এসব বড় পুঁজির বিরুদ্ধে যেতে পারবে?
আমাদের অভিজ্ঞতা কিন্তু ভালো কিছু বলে না। এমনকি নির্বাচিত সরকারগুলোকেও আমরা এ ধরনের বিষয়ে শক্ত ভূমিকা নিতে দেখিনি। ১৯৯০ সালের পর প্রথম কয়েকটি নির্বাচনকে তো আমরা গ্রহণযোগ্য বলতে পারি। সেসব সরকারও বড়, মন্দ পুঁজির সঙ্গে আপসই করে গেছে। যারা দুর্বৃতায়িত বড় পুঁজির মালিক, তারা সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে চট করে নিজেদের অবস্থান বদলে ফেলে। আজ তারা এই সরকারের বন্ধু, কাল অন্য সরকারের। এই অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে বলতে পারি, ক্রস ওনারশিপ সংক্রান্ত সুপারিশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। সেটার জন্য আমাদের গণতন্ত্রকে অনেক দূর পথ হেঁটে যেতে হবে। মিডিয়ার কার্যক্ষেত্রের পরিসর দেশের গণতান্ত্রিক পরিসরের ওপরে গভীরভাবে নির্ভরশীল। এই দুইয়ের সম্পর্কটি সরাসরি। আমরা এখনো সে পর্যায়ের গণতন্ত্রে পৌঁছাতে পারিনি, যেখানে এ ধরনের সংস্কার সম্ভব। গ্রহণযোগ্য মাত্রার গণতান্ত্রিক পরিসর তৈরি না হলে মিডিয়ার স্বাধীনতা চর্চা করা কঠিন।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: আপনি বলছিলেন নতুন ধরনের সাংবাদিকতার কথা। সেক্ষেত্রে কি মনে করেন নিউ মিডিয়ার উত্থানকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে? ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়া-কেন্দ্রিক সাংবাদিকতা? এতদিন যে ভাগ ছিল— টিভি, পত্রিকা, অনলাইন, এখন তো সব মিলে গেছে। সবাই সব ধরনের কন্টেন্ট করছে। সাংবাদিকতার এই পরিবর্তিত জায়গাটা রিপোর্টে আসেনি। এই জায়গাটা আসা কতটা দরকারি ছিল বলে মনে করেন?
সাজ্জাদ শরিফ: নিউমিডিয়ার অংশটায় ঘাটতি আছে। তবে দুটো বিষয়কে আমি আলাদা করে দেখতে চাই। প্রথমত, যে নতুন মিডিয়া–বাস্তবতা আমাদের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে, সেটি এখনও নির্মীয়মাণ। সত্যি বলতে কী, পশ্চিমের দেশগুলোতেও এখনও পরিষ্কারভাবে বুঝে উঠতে পারছে না যে কী পদক্ষেপ নিতে হবে। পুরো বিষয়টাই প্রযুক্তিনির্ভর, আর প্রযুক্তি সারাক্ষণই বদলাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার নীতি ঘন ঘন বদলাচ্ছে, অ্যালগরিদম সারাক্ষণই পাল্টে যাচ্ছে, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিটা গণমাধ্যমকে অবিরাম খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। একটা ভীষণ রকম ইঁদুর দৌড় চলছে। কোনো মুহূর্তে সামান্যতম স্থিরতা নেই। এটাই এখনকার বাস্তবতা। এই বাস্তবতায় আমাদের গণমাধ্যমগুলো ঢুকে পড়েছে। বাংলাদেশে ছত্রাকের মতো অসংখ্য অনলাইন মিডিয়া তৈরি হয়েছে, যেগুলোর কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার কথা বাদই দিলাম। আমাদের দেশে মিডিয়া সাক্ষরতা কম বলে সমাজে তথ্য নিয়ে একটা বড় বিভ্রম তৈরি হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ইউটিউবার বা টিকটকার জাতীয় নানা ধরনের মানুষ সামনে চলে এসেছে। তাদের সাংবাদিক বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। ফলে সাংবাদিকতা সম্পর্কেই একটা বিভ্রান্তিকর আবহাওয়া তৈরি হচ্ছে। অবশ্যই আমি বলব না যে প্রথাগত সাংবাদিকদের সবাই খুব বিশুদ্ধ ছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি এখন আরও জটিল। এই পটভূমির কারণেই রিপোর্টে নিউমিডিয়া নিয়ে ভালো কিছু থাকা দরকার ছিল। কারণ নিউমিডিয়া গণমাধ্যমের পুরো দৃশ্যপটই পাল্টে দিচ্ছে।
গত দেড়শো থেকে দুইশো বছরে প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকতা আর ব্যবসার মডেল একটা বোঝাপড়ার জায়গায় চলে এসেছিল। সেটা ছিল একটা স্থির জগৎ। গত কয়েক বছরে সেই কাঠামোটা অতি দ্রুত ভেঙে পড়েছে। কোভিডের পর থেকে এই ভাঙনটা সুনামির গতিতে হয়েছে। কোভিডের সময় ঘরবন্দী মানুষের কাছে অনলাইন আর ডিজিটাল স্পেসই প্রধান হয়ে উঠল। আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম, প্রিন্ট মিডিয়ার ভাঙন ঘটতে ২০–২৫ বছর লাগবে। কোভিড এসে সেই সময়টাকে ১৫–২০ বছর কমিয়ে দিয়েছে। নতুন বাস্তবতায় আগের পুরো মডেলটাই তছনছ হয়ে গেছে। আমরা এখনও জানি না, ডিজিটাল স্পেসে কীভাবে টেকসই মার্কেটিং করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত যেকোনো মিডিয়াই তো প্রধানত বিজ্ঞাপনি আয়ের ওপর নির্ভরশীল। সেই বিজ্ঞাপনের জগতের লোকেরাও বিষয়টা পুরো বুঝে উঠতে পারেনি। এই বোঝাপড়ার প্রাথমিক পর্যায় পার হতে পাঁচ থেকে দশ বছর লাগবে। এই বাস্তবতায় আমার গভীর আশঙ্কা যে আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে দেশের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর মিডিয়াগুলো বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়বে। সেটা সামলে যারা আগে বাড়তে পারবে, তারাই টিকে থাকবে। এই সময়ে মিডিয়াকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের একটা সহযোগী ভূমিকা থাকা দরকার। রাষ্ট্র সরাসরি কোনো সাহায্য করবে, সে কথা বলছি না। সেটা না করাই ভালো। তবে নীতিগত কিছু সিদ্ধান্ত দরকার। অর্থনীতি, ভ্যাট, মাশুল, নিয়মকানুন, সাংবাদিকতার সুরক্ষা এই ধরনের জায়গায়— যাতে মিডিয়াগুলো অন্তত এই পাঁচ–দশ বছরের লড়াইয়ে টিকে থেকে পার হয়ে পরবর্তী পর্যায়ে ঢুকতে পারে। এই বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যম কমিশনের প্রস্তাব থাকতে পারত।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: নিউমিডিয়ার সঙ্গে সঙ্গে কনটেন্টের ধরনেও এক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এখন প্রতিটা কনটেন্টই ইনকামযোগ্য, ইনকাম করছে। মিডিয়া হাউজগুলোতে কন্টেন্ট নিয়ে আলাদা করে ভাবা হচ্ছে। সাংবাদিকতায় আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে? সিঙ্গেল কন্টেন্টের দিকে এতটা নজর কি আগে ছিল? না থাকলে এই পরিবর্তনটা কি কমিশনের রিপোর্টে এসেছে?
সাজ্জাদ শরিফ: না, ওইভাবে আসেনি। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন এই পরিবর্তনের চাপ কতটা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছে, আমি তা জানি না। এই যে জাপানের অন্যতম বড় পত্রিকা ইউমিউরি শিম্বুন গুগলের বিরুদ্ধে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে মামলা করেছে। তাদের অভিযোগ, এআই তাদের বিপুল পরিমাণ কন্টেন্ট ব্যবহার করে পাঠকদের কাছে তথ্য বিতরণ করেছে, অথচ কন্টেন্ট তৈরির জন্য ইউমিউরি শিম্বুনকে প্রচুর টাকা খরচ করতে হয়েছে। এখন তারা বলছে, এর জন্য বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
বাংলাদেশে তো আমরা এ ধরনের আলোচনা শুরু করার জায়গাতেই নেই। আমি যদি ভুল না করে থাকি, বাংলাদেশের ৩ শতাংশ মানুষ এখন এআইয়ের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে। কিন্তু বাংলাদেশ এমন একটা দেশ, যেখানে সবাই নতুন প্রযুক্তি খুব দ্রুত গ্রহণ করে। আগামী দুই–তিন বছরের মধ্যে সবাই যদি এই নতুন জগতে ঢুকে পড়ে, তাহলে তো বিরাট ঝুঁকি। এ দেশের গণমাধ্যম বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ব। এসব বিষয়ে আমাদের গণমাধ্যমের সচেতনতা অত্যন্ত কম। এই নতুন জগতের চাপ তাই মিডিয়া কমিশনে কমই প্রতিফলিত হয়েছে।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: এই পরিপ্রেক্ষিতে তাহলে প্রশ্ন জাগে— কমিশনের সদস্যদের গঠন নিয়ে কি কোনো বক্তব্য আছে? আমাদের মনে হয়েছে, কমিশনে নিউ মিডিয়া বা ফ্যাক্ট চেকিং সংক্রান্ত কাজের অভিজ্ঞতা আছে এমন কাউকে রাখা দরকার ছিল।
সাজ্জাদ শরিফ: থাকলে নিশ্চয়ই ভালো হতো। আরও বৈচিত্র্য থাকলে নিশ্চয়ই বিভিন্ন ব্যাপার উঠে আসতে পারত। তবে যারা ছিলেন সাধারণভাবে তাদের মন–মানসিকতা ইতিবাচকই ছিল। তবে সামগ্রিকভাবে কমিশনের গঠনে আমাদের মিডিয়া জগতের বাস্তব চিত্রের প্রতিফলনই ঘটেছে। সারা বিশ্বের মিডিয়াজগত এখন অস্থির একটা অবস্থার মধ্যে আছে। আমাদের অবস্থা আরও খারাপ।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এই সময়ে বেশ প্রভাবক হয়ে উঠছে। কমিশনের রিপোর্টে এআইয়ের উল্লেখ কতটা দরকারি ছিল বলে মনে করেন?
সাজ্জাদ শরিফ: বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে কোনো মিডিয়া হাউজই এখনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে পরিকল্পিতভাবে ভাবতে শুরু করেনি। আমরা এআই ব্যবহার শুরু করেছি, তবে এখনো সেটা প্রাথমিক স্তরে। আমরা নানা কাজে এআইয়ের সহযোগিতা নিচ্ছি। তবে এআইকে লেখক বা চালকের আসনে বসানো যায় না। সেটা অনৈতিক ও বিপজ্জনক। আজকেই আমরা একটা রিপোর্ট প্রকাশ করেছি, সেখানে একটা স্টাডির কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে এআই খুবই তোষামুদে স্বভাবের ও চাটুকারপ্রবণ। এআইয়ের মধ্যে তার ব্যবহারকারিকে খুশি করার প্রবণতা আছে। ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী সে তথ্য সরবরাহ করে। সোশ্যাল মিডিয়া যেমন একটা কুয়োর মতো— যে যা পছন্দ করে তাকে সেই ভালো লাগার ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে আটকে রাখে, এআইও অনেকটা তেমনই। ব্যবহারকারী মনে করে সে একটা পুরো মহাবিশ্বমণ্ডল দেখছে, কিন্তু বাস্তবে সে আছে একটা কুয়োর ভেতরে। এআইয়ের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি মারাত্মক। এ কারণেই এআই জেনারেটেড কনটেন্ট ঝুঁকিপূর্ণ।
আরেকটা গভীরতর সংকট আছে, সেটা নিয়ে এখনো কোথাও কোনো ভাবনাচিন্তা শুরু হতে দেখিনি। গত কয়েক দশক ধরে তো পশ্চিমা জ্ঞানকাণ্ডের আধিপত্য নিয়ে নানা বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যালোচনা চলছে। কারণ সেটা বিশ্বে ঔপনিবেশিক শাসনসহ নানা ধরনের দাসত্ব আমাদের ওপর আরোপ করেছে। এই যে এআইয়ের জগতে ঢুকছি, এআই তো বিদ্যমান জ্ঞানভান্ডারের ভেতর থেকেই তথ্য দেয়। আর সেই জ্ঞানভান্ডারের বড় অংশটা এখনো পশ্চিমা। ফলে এআইয়ের মধ্য দিয়ে আবারও এক ধরনের ইন্টেলেকচুয়াল কলোনাইজেশন ঘটতে শুরু করেছে। দীর্ঘ এতসব বিতর্কের পর আবারও আমরা নতুন করে উপনিবেশের কণ্টকমুকুটশোভা পরছি কিনা সেটা একটা বড় বিতর্ক হিসেবে সামনে আসবে বলে আমি মনে করি। এআই মিডিয়া হাউজের চেহারা পুরোই পাল্টে দেবে। আগে কর্মীদের যে দক্ষতাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেগুলোর অনেক কিছু আর কাজে লাগবে না। যেমন অনুবাদ। এই পেশাটা হয়তো সামনে আর থাকবে না। সম্পাদনার বহু কাজ, গবেষণার বহু অংশ, স্টোরির ইন্ট্রো তৈরি, রিপোর্টে সমস্যা বা তথ্যের ঘাটতি চিহ্নিত করা, কনটেক্সট তৈরি করা, লেখার সারমর্ম তৈরি, ইনফোগ্রাফিক্স বানানো—সবকিছুই এআই দিয়ে করা যাবে। হয়তো আরও বহু কিছু যা আমরা এখনো জানি না।
বাংলাদেশে যেখানে ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যমই এখনও শক্তভাবে দাঁড়াতে পারেনি, ফলে প্রয়োজনীয় পরিমাণে দক্ষ সাংবাদিক সেভাবে তৈরি হয়নি, সেখানে এসব রূপান্তর ধরনের চাপ যে তৈরি হবে, সেটা হয়তো আমরা অনুমানও করতে পারছি না। এমন পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে, যেখানে মিডিয়া হাউজ থাকবে প্রায় জনশূন্য, চার–পাঁচজন লোক হয়তো থাকবে বিভাগের প্রধান, বাকিটা এআই দিয়ে চলছে। এ জাতীয় পরিস্থিতি অসম্ভব নয়। এআই জেনারেটেড কনটেন্ট নিয়ে সারা বিশ্বেই উদ্বেগ আছে। বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়াতে এরই মধ্যে তা একটা বড় চাপ তৈরি করেছে, যা সমাজের সুস্থ বাতাবরণ নষ্ট করছে। এআইকে হরেদরে খারাপ বলছি না। কিন্তু আমাদের বোঝার ব্যাপার আছে, সতর্ক হওয়ার দরকার আছে। বাংলাদেশের বিদ্বিষ্ট ও বিভক্তিপ্রবণ সমাজে এর বিপজ্জনক প্রভাব পড়তে পারে, মিডিয়া হাউজগুলো যার বাইরে থাকতে পারবে না। এআই ব্যবহার এখন মিডিয়া হাউজের জন্য অসম্ভব জরুরি হয়ে উঠেছে, এটা যেমন সত্য; তেমনি প্রতিটা মিডিয়া হাউজে একটা বাধ্যতামূলক এআই এথিকসের দিকনির্দেশনাও থাকা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। মিডিয়া কমিশন রিপোর্টে কী করতে পেরেছে বা পারেনি, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু মিডিয়াহাউজগুলোকে নিজের দায়িত্বেই এটা করতে হবে। অবশ্য কমিশন এ বিষয়ে কিছু দিকনির্দেশনা দিলে কাজ অনেক সহজ হতো।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: বিজ্ঞাপনের প্রসঙ্গ এলো। আমরা দেখেছি, রিপোর্টে একদিকে গণমাধ্যমকে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে দেখতে চাওয়া হয়েছে, আবার একইসঙ্গে গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবেও দেখার কথা বলা হয়েছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে কমিশনের রিপোর্টটা ঘুরপাক খাচ্ছিল বলে মনে হয়েছে। আপনার কাছে কী মনে হয়— গণমাধ্যমের আদতে কোন রোলে থাকা উচিত, আর সেটা কীভাবে সম্ভব?
সাজ্জাদ শরিফ: এটা একটা জটিল সমীকরণ। গণমাধ্যমকে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে না দেখলে তো সমস্যা আছে। একটা পত্রিকা ছাপাতে আমাদের যে খরচ পড়ে, তার প্রায় আড়াই ভাগ কম খরচে আমরা সেটা বিক্রি করি। হকার আর এজেন্টকে কমিশন দিয়ে হাতে আসে আরও কম। মানে প্রতি কপিতে লোকসান হয় প্রচুর। যার যত সার্কুলেশন, তার লোকসানও তত বেশি। এর পর তো এস্টাবলিশমেন্ট ব্যয়, অফিস খরচ, বেতন সব মিটিয়ে পত্রিকাকে লাভজনক হতে হয়। পত্রিকাকে টিকে থাকতে হলে তাকে অবশ্যই আর্থিকভাবে লাভজনক হতে হবে। কিন্তু এখানেই আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। কোনো পত্রিকা যদি ভালো সাংবাদিকতা না করে, তাহলে পাঠক তো সেটা কিনবে না। লাভ করতে চাইলে আমাকে এমন সাংবাদিকতা করতে হবে, যাতে পাঠকের মধ্যে এই আস্থা তৈরি হয় যে এই পত্রিকা আমাকে নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত তথ্য দিচ্ছে। ফলে ভালো সাংবাদিকতা আর লাভজনক প্রতিষ্ঠান একটি আরেকটির সঙ্গে যুক্ত।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: এইটা কিন্তু মার্কেটের যে কোনো পণ্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
সাজ্জাদ শরিফ: একদম। এই কারণেই মিডিয়ার চতুর্থ স্তম্ভ হয়ে ওঠা আর আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। কারণ শেষ পর্যন্ত একমাত্র ভালো সাংবাদিকতাই পত্রিকাকে টিকিয়ে রাখে। দুর্বল বা অপসাংবাদিকতা দিয়ে গণমাধ্যমের পক্ষে টেকা সম্ভব নয়। যদি একজন পাঠক বোঝে যে অমুক জায়গায় গেলে সে ভালো খবর পাবে, ভালো স্টোরি পাবে, ভালো এডিটোরিয়াল (সম্পাদকীয়) পাবে, পোস্ট-এডিটোরিয়ালে চিন্তার বৈচিত্র্য পাবে, তাহলে সে সেই পত্রিকাটাই পড়বে বা সেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মেই যাবে। আর যেখানে পাঠক বেশি যাবে, বিজ্ঞাপনদাতারাও সেখানে বিজ্ঞাপন দিতে চাইবে। কারণ তারা চায় এমন জায়গা, যার মাধ্যমে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। তখন সেই মিডিয়াটা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে। ভালো ব্যবসার মূল উপাদানই হচ্ছে ভালো সাংবাদিকতা। একইসঙ্গে ভালো সাংবাদিকতাই ভালো ব্যবসার গ্যারান্টি। আর যেহেতু ভালো সাংবাদিকতা করেই সে ব্যবসা করছে, সেহেতু ভালো সাংবাদিকতা করতে পারলেই সে চতুর্থ স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারবে। এখানে একটার সঙ্গে আরেকটা যুক্ত।
তবে সম্পাদকীয় অবস্থানের বড় একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ এমন হতে পারে যে কোনো একটি সমাজে একটা বড় অংশের মানুষ রিগ্রেসিভ হয়ে উঠছে। পৃথিবীর অনেক জায়গায় আমরা এই লক্ষণ দেখেছি। হিটলার তো নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতায় এসেছিল। সেই সময়ে কোনো পত্রিকা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পক্ষে অবস্থান নিলে সেটা মানবতারই বিরুদ্ধে যেত। ফলে পজিশন নেওয়ার প্রশ্নটা জটিল। কোন পত্রিকা কী অবস্থান নেবে, সেটা যার যার দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। তবে শেষ পর্যন্ত ভালো সাংবাদিকতার কোনো বিকল্প নেই। ভালো সাংবাদিকতাই তাকে ব্যবসায়িকভাবে দাঁড়াতে সাহায্য করে, আবার সেই ভালো সাংবাদিকতাই তাকে চতুর্থ স্তম্ভ হয়ে উঠতে সহায়তা করে।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: একটা সম্পূরক প্রশ্ন। সামনের দিনে যে সাংবাদিকতা আসছে, সেখানে কি শুধু কনটেন্ট বেঁচে, যদি আমি কনটেন্টকে পণ্য হিসেবে ধরি— পণ্য বিক্রি করে কী সাংবাদিকতা করা সম্ভব হবে?
সাজ্জাদ শরিফ: এখানে অনেকগুলো স্তর আছে। আমি যদি প্রশ্নটা ঠিক বুঝে থাকি, তাহলে এখন এমন একটা সময় আসছে, যেখানে শুধু কী লিখলাম, সেটা আর একমাত্র বিষয় নয়। কীভাবে পাঠককে যুক্ত করলাম, ক্লিকবেইট করলাম, কীভাবে কনটেন্ট ডিস্ট্রিবিউট করলাম— এই বিষয়গুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই জায়গাগুলোতেই আসলে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। আমি মনে করি, প্রযুক্তি বদলাবে, মিডিয়ার অভ্যস্ততা বদলাবে। কিন্তু সাংবাদিকতার যে মৌলিক নীতি, সেটা থাকলেই সাংবাদিকতা টিকে থাকবে। এটা নষ্ট হলে সাংবাদিকতাও টিকবে না। বাংলাদেশে ভালো সাংবাদিকতার একটা ক্ষয় আমি স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি। পপুলিজমের কাছে যেমন রাজনীতি আত্মসমর্পণ করছে, তেমনি সাংবাদিকতাও অনেক ক্ষেত্রে পপুলিজমের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। এটা খুব বিপজ্জনক। তুমি যে একক কনটেন্টের দিকে ঝুঁকে পড়ার কথা বললে, এবং সেটার মধ্য দিয়ে ব্যবসা করার কথা বললে— এর মধ্যে বড় বিপদ আছে, সেটা আমি অস্বীকার করব না। একটা বিষয় পরিষ্কার— পৃথিবীর কোনো দেশেই শুধুমাত্র বিজ্ঞাপন দিয়ে অনলাইন মিডিয়া টিকছে না। তাদের কনটেন্ট বিক্রি করতেই হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, কনটেন্ট কীভাবে বিক্রি করবে। ক্লিকবেইট দিয়ে, না অন্য কোনো পথে? ধরো, আমি যদি বলি সাবস্ক্রিপশন মডেলে যাব, সেটা সাধারণ সাংবাদিকতারই বিতরণের একটা সাব্যস্ত পথ। একক কনটেন্ট যিনি বিক্রি করছেন, তার কোনো সম্পাদক আছে কিনা আমরা জানি না। এটার পথবিচ্যূত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। দীর্ঘস্থায়ী সময় ধরে কনটেন্ট বিক্রি করতে চাইলে পাঠকের আস্থা প্রয়োজন হবে। দুই–চারটা কনটেন্ট দিয়ে সেটা হবে না।
আর এখানেই সাংবাদিকতার নীতি–নৈতিকতার গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। সময়টা এখন ফ্লুইড। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে সাংবাদিকতার চেহারাও ফ্লুইড হয়ে উঠছে। তুমি যদি ক্লিকবেইট দিয়ে কনটেন্ট বিক্রি করো, একটা সময়ে পাঠক বুঝে ফেলবে। তুমি যদি পপুলিজমে যাও, এক সময় পাঠক মুখ ফিরিয়ে নেবে। তুমি যদি ক্লিকবেইট না করে দায়িত্ববান সাংবাদিকতা করো, তাহলে হয়তো পাঠক কম হবে, কিন্তু যারা থাকবে, তারা সিরিয়াস পাঠক। তারা টাকা দিয়ে হলেও তোমার স্টোরি পড়বে। সাবস্ক্রিপশন মডেলে যেতে হলে তোমাকে এমন কনটেন্ট দিতে হবে, যেখানে নতুনত্ব আছে, অভিনবত্ব আছে, প্রাসঙ্গিকতা আছে, যেখানে নীতি–নৈতিকতা মানা হয়েছে, পাঠক যে লেখায় পটভূমি পায়, নতুন তথ্য পায় এবং পড়ার শেষে তৃপ্তি পায়। সেই স্টোরি হয়তো দশজনকে না টেনে পাঁচজনকে টানবে। কিন্তু যারা পড়বে তারা যথার্থ সাংবাদিকতার জন্য তৃষ্ণার্ত। শেষ পর্যন্ত সেটাই মিডিয়ার ভিত্তি।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: বিজ্ঞাপন তো নানাভাবে সাংবাদিকতাকে আকৃতি দেয়। একটা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লেখা থেকে বিরত রাখে— এরকম উদাহরণ তো আছে। আপনি বিজ্ঞাপন নির্ভরতার কথা বললেন, সেক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন নির্ভর হলে সাংবাদিকতা কম্প্রোমাইজ হওয়ার ঝুঁকি তো থেকেই যায়?
সাজ্জাদ শরিফ: বিজ্ঞাপনের কারণে কারও বিরুদ্ধে না লেখার সিদ্ধান্ত যে কেউ কখনো নেয়নি, তেমন কথা আমি বলতে পারব না। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, কোনো মিডিয়া হাউজ যদি এমন কাজ বারবার করতে থাকে, সেটা আর অপ্রকাশ্য থাকতে পারে না। তখন তাদের ওপর পাঠকের আস্থা চলে যায়। তাই কোনো মিডিয়া টেকসইভাবে পাঠকের ওপর নির্ভর করে থাকতে হলে নৈতিক সাংবাদিকতার কোনো বিকল্প নেই। সাংবাদিকতা করতে গিয়েই হোক কিংবা বিজ্ঞাপন নিয়ে কিছু করতে গিয়েই হোক— একবার পাঠকের আস্থা হারালে, সেটা ফিরে পাওয়া কঠিন।
বাংলাদেশের মিডিয়াতে যদি অম্বুডসম্যান বা পাবলিক এডিটরের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে বেশ হতো। এসব নিয়ে ভাবার সময়টাই এসেছে। বহু পত্রিকার পক্ষেই অম্বুডসম্যান (ন্যায়পাল) রাখা খুব কঠিন। কিন্তু যদি সংবাদপত্র পরিষদের মাধ্যমে সবার জন্য একজন অম্বুডসম্যান রাখা যেত— একজন স্বাধীন ব্যক্তি, যিনি সব মিডিয়ার অর্থায়নে চলবেন, কিন্তু স্বাধীনভাবে কাজ করবেন, তাহলে তিনি কারও কাছে আলাদাভাবে দায়বদ্ধ থাকতেন না। এরকম কিছু হলে বাংলাদেশের মিডিয়ায় জন্য ভালো হতো।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: আমরা ৫ আগস্টের পরের সময়ে আসি। পতিত সরকারের আমলে মূলধারার গণমাধ্যম প্রধানত আওয়ামী প্রোপাগান্ডা মেশিনে পরিণত হয়েছিল। শুধু তাই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিডিয়া সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে জোট বেঁধে সরকারি বয়ান প্রতিষ্ঠা এবং বিরোধী মত দমনে কাজ করেছে। নেক্সাস বা সিন্ডিকেট ভাঙার কোনো দিকনির্দেশনা কি কমিশনের প্রতিবেদনে পেয়েছেন? এই পরিস্থিতি বদলাতে কী করা যেতে পারে?
সাজ্জাদ শরিফ: কমিশন কিছু বিষয় করার চেষ্টা করেছে। আমি বলব না যে তারা কিছুই করতে চায়নি। ক্রস ওনারশিপ নিয়ে তারা কথা বলেছে। দুর্বৃত্তায়িত অর্থ যেন মিডিয়াতে না ঢোকে, সেটা নিয়েও তারা বলতে চেয়েছে। পত্রিকাগুলো যেসব মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সার্কুলেশন ইত্যাদি এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতাগুলো আনতে পারলে নামেমাত্র পত্রিকাগুলো হয়তো পিছটান দিত। বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এগুলো রোধ করব কীভাবে? খুব কঠিন। আবার রাষ্ট্র কোথায় কীভাবে ভূমিকা রাখবে, সেখানেও স্পর্শকাতরতা আছে। কেউ মিডিয়া করতে গেলে তার জন্য ন্যূনতম কিছু পালনীয় শর্ত থাকা জরুরি। সম্পাদকের যোগ্যতা, টাকার উৎস, এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। মিডিয়া কমিশন এসব নিয়ে কিছু প্রস্তাব রেখেছে। সেগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে মিডিয়ার অপব্যবহার কিছুটা রোধ করা যেত। বাংলাদেশের মতো জায়গায় সমস্যা হলো রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল নিজে এসবে জড়িয়ে পড়ে। আইন অমান্য করায় বা আইনের ফাঁক খুঁজে বের করায় আমাদের দক্ষতার কোনো তুলনা নেই। রিপোর্টে যা আছে, সেসব বাস্তবায়ন করা গেলেও আপাতত যথেষ্ট। কিন্তু সেটাও তো আর হবে বলে মনে হচ্ছে না। এটা খুব দুর্ভাগ্যজনক। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, নতুন সরকার আসবে, শুরুর দিকে কিছু কথাবার্তা হবে, তার কিছুদিন পর সব চুপচাপ হয়ে যাবে। যে যার পথে চলবে।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: কমিশনের প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে বেশ কিছু প্রস্তাব আছে, এবং সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের একটি খসড়া রয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকদের দায়বদ্ধতার বিষয়ে তেমন জোর দেওয়া হয়নি, শুধু প্রেস কাউন্সিল পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখেন?
সাজ্জাদ শরিফ: এখানে নানা কিছু দেখার আছে। বাংলাদেশে এমন অনেক আইন এখনো বহাল আছে, যেগুলোর কারণে সাংবাদিকতা করা কঠিন। সেগুলো সাংবাদিকতার হাতে হাতকড়া পরিয়ে রেখেছে। এর অনেকগুলোই উপনিবেশ আমলে তৈরি। আমরা ১৯৪৭ দেখেছি, ১৯৭১ দেখেছি, আমরা উপনিবেশ ছেড়ে এসেছি, স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা করেছি, কিন্তু আইনগুলো দিব্যি বহাল আছে। এর মানে কী? আমরা মুখে স্বাধীন রাষ্ট্র বলি, কিন্তু আইনগুলো উপনিবেশিক। মানে কার্যত আমরা এখনও ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার মধ্যেই আছি। আমার প্রস্তাব হচ্ছে, যতদিন পর্যন্ত না এসব আইন সংশোধন বা বাতিল হচ্ছে, ততদিন সাংবাদিকতার জন্য সুরক্ষার পরিসর তৈরি করতে একটা অন্তর্বর্তী আইন হোক— যাতে সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে কোনো মামলা হলে সব আইনের ওপরে অন্তর্বর্তী আইনটি কার্যকর হবে। সে রকম কিছু তো হয়নি। সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের যে খসড়া আমলারা সংশোধন করেছে, সেখানে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে তথ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যপরিধি বদলাতে হবে বলে তারা এটা করতে পারছে না। এই যুক্তি তো ভয়ংকর। এটা আমলাতান্ত্রিক ধৃষ্টতা। ২০২৪ সালের গণ–আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি বেঈমানি। গত সরকারের আমলে তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য যেসব চক্র কাজ করেছে, তার মধ্যে এক শ্রেণির মিডিয়া সরাসরি যুক্ত ছিল। অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে তারা সরকারের বৈধতা তৈরির কাজ করেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কীভাবে রোধ করব। আবার সেটা করতে গিয়ে যেন সাংবাদিকতার স্বাভাবিক পরিসর আবার আমরা ধ্বংস করে না ফেলি।
একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন করে আত্মনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা গেলে সবচেয়ে ভালো হতো। তাহলে এসব বিষয়ে অনেক কিছু করার সুযোগ থাকত। আরেকটা আশা ছিল যে দেশের দ্বিধাবিভক্ত সাংবাদিক সমাজ একীভূত হবে। তা–ও হয়নি। সাংবাদিক সমাজই যদি বিভক্ত থাকে, তাহলে সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতার জায়গা কোথায় থাকে? এই সরকার প্রস্তাবিত মিডিয়া কমিশন করেনি। সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের যে খসড়া আমলাদের হাতে আছে, তাতে মিডিয়ার জন্য আদৌ কোনো খোলা বাতায়ন থাকবে কি না— সে ব্যাপারে আমি ঘোরতর সন্দিহান।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: বিগত সময়ের সরকারকে যে সব মিডিয়া সার্ভ করেছে, তাদের রিকনসিলিয়েশন নিয়ে কোনো আলাপ দেখিনি। আপনার কি মনে হয়, এই বিষয়টা মিডিয়া কমিশনের রিপোর্টে থাকা উচিত ছিল?
সাজ্জাদ শরিফ: এটা কমিশনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে কি না, আমি নিশ্চিত নই। পড়তে পারে, নাও পড়তে পারে। আমাদের মিডিয়া দৃশ্যপট এত জটিল ও বিপুল যে সবকিছু একটা কমিশনে ধরতে গেলে অনেক সময় লাগবে। বহু প্রশ্ন আছে—ট্যাক্স, ইনভেস্টমেন্ট, সার্কুলেশন, আঞ্চলিক প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি, ডিজিটাল স্পেস, টেকনোলজি, এথিকস, জেন্ডার ইস্যু—সবকিছু এত অল্প সময়ে একসঙ্গে শেষ করা কঠিন। মিডিয়া কমিশন এ ব্যাপারে কিছু করতে পারত কিনা সেটা একটা প্রশ্ন। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, কোনো সমাজ প্রতিহিংসার ওপরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
আমি গত আন্দোলনের বড় সমর্থক ছিলাম। তাই কেউ যেন আমাকে এই তকমা না দেয় যে আমি ফ্যাসিস্টের দোসর। আওয়ামী শাসনামলে কেউ যদি অপসাংবাদিকতার মাধ্যমে বেআইনি কিছু করে থাকে বা সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করে অপরাধ করে থাকে, তাহলে সুষ্ঠু তদন্ত করে তাদের শাস্তি দেওয়া হোক। মিথ্যা মামলা দিয়ে এত এত সাংবাদিককে কারাবন্দী করে রাখা মানে আগের সরকারের মতো একই অন্যায় জারি রাখা। অবশ্য এর বাইরে একটা কথা আছে। কেউ করেছেন অপরাধ, কেউ করেছেন অনৈতিক কর্ম। বহু সাংবাদিক অনৈতিক পথে চলে গিয়েছিলেন। তাদের জন্য আলাদা কোনো কিছু করার হয়তো দরকার ছিল; হয়তো একটা রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়ায় মধ্য দিয়ে যাওয়া যেত।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: এই কারণেই প্রশ্নটা তুললাম। বিগত সরকারের সময় যে কয়েকটি মিডিয়া এসেছে, তাদের প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারই ছিল আওয়ামী লীগ সরকারকে সার্ভ করা। ৫ আগস্টের পর তাদের অঙ্গীকার কী— এই বিষয়টা নিয়েও তো আলাপ হওয়া উচিত।
সাজ্জাদ শরিফ: আমাদের মিডিয়ার চরিত্র আসলেই কতটা বদলেছে? আগে হয়তো উত্তর দিকে হেলে ছিল, এখন দক্ষিণ দিকে হেলেছে। কিন্তু তোষণের চরিত্র তো একই রয়ে গেছে। মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। অন্তবর্তী সরকার মিডিয়ার জন্য কোনো ভূমিকা রাখেনি। নির্বাচিত যে সরকার আসবে, তারা কী করবে, বলা কঠিন। প্রথম আলোর গোলটেবিল আলোচনায় বিএনপির প্রতিনিধি বললেন, তারা গণমাধ্যম কমিশন গঠন করতে চায়। যদি তারা স্বাধীন ও কার্যকর একটি গণমাধ্যম কমিশন প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে আমরা স্বাগত জানাব। আমার গভীর সংশয় আছে। কারণ ইতিহাস বলে, কোনো সরকারই এমন কাঠামো তৈরি করতে চায় না, যেখানে তার নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা অবাধে করা সম্ভব হয়।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: গণমাধ্যমের ঐতিহাসিক পরিক্রমায় কি কোনোভাবে পক্ষপাত করা হয়েছে বলে মনে করেন? বিএনপি আমলেও সাংবাদিকতা নানা ভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। বিগত সরকারের সময়কে বেশি ফোকাস করতে গিয়ে কি বিএনপি সময়কে কি ছাড় দিয়ে দেখানো হয়েছে বলে মনে করেন?
সাজ্জাদ শরিফ: আমি মনে করি, এই সমালোচনাটা একদম সত্য। বাস্তবতা হচ্ছে— বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকারের আমলেই সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল না। আমরা কখনোই শান্তিতে সাংবাদিকতা করতে পারিনি। আমাদের অনলাইন সংস্করণ প্রথম বন্ধ করা হয়েছিল বিএনপি সরকারের সময়েই। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে আবার নতুন করে সমস্যা শুরু হয়। শেখ হাসিনা সংসদে আমাদের নিয়ে প্রকাশ্যে বিষোদ্গার করেছেন। প্রতিটি সরকারের আমলেই আমরা ভুক্তভোগী হয়েছি। তবে এটাও বলতে হবে যে গত পনেরো বছরে পরিস্থিতি অসহনীয় অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছিল। তার মানে এই নয় যে আগের সরকারগুলো আদর্শ ছিল। কোনো সরকারই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য কাঠামোগত আইন পরিবর্তন করেনি।
এই প্রবণতাটা শুধু গণমাধ্যম কমিশনের রিপোর্টেই নয়, জুলাই ঘোষণাতেও দেখা গেছে। সেখানে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে কেন্দ্র করে সব অন্যায়ের বিবরণ এসেছে। সেসব নিয়ে দ্বিমত নেই। ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত রূপ আমরা তাদের আমলে দেখেছি। কিন্তু এখন যে বয়ান তৈরি হচ্ছে, সেখানে বাকিরা সবাই যে ফেরেশতা। এটাও ঠিক নয়। গণতন্ত্র ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য কোনো সরকারই প্রকৃত পরিসর তৈরি করতে চায়নি। বিগত সরকার তাদের দমনযন্ত্রকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু দায় সবারই আছে।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: সময় দেয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
(এই সাক্ষাৎকারটি গত ২ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে নেওয়া হয়। ১৮ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সংগঠক ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তীতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার ঘটনার অনেক আগেই এটি ধারণ করা হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই, ওই সময়ে এই সমসাময়িক বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল না।)
মীর হুযাইফা আল মামদূহ দৃকে গবেষক হিসেবে কর্মরত আছেন।