শুক্রবার ২৯শে ফাল্গুন ১৪৩২ Friday 13th March 2026

শুক্রবার ২৯শে ফাল্গুন ১৪৩২

Friday 13th March 2026

সাক্ষাৎকার

সাংবাদিকের বয়ানে সংবাদমাধ্যমের সরকার তোষণ

২০২২-০৩-২৭

নাইম সিনহা
দৃকনিউজ রিপোর্টার

সাংবাদিকের বয়ানে সংবাদমাধ্যমের সরকার তোষণ

আমি ব্যক্তিগতভাবে বাম ধারার রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী।

 

ছাত্রজীবনে প্রগতির পরিব্রাজক দল-প্রপদ, ছাত্র গণমঞ্চের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ২০১৫ সালের শুরুতে আমি কর্মজীবনে প্রবেশ করি। বরাবরই খবর সম্পাদনা অর্থাৎ এডিট করাই ছিল আমার কাজ। পেশাগত কাজের বাইরে আমি যেকোনও আন্দোলনে ব্যক্তিগতভাবে সংহতি জানানোর চেষ্টা করি, তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াই। তারই অংশ হিসেবে গত ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবির) প্রগতিশীল ৯ ছাত্র সংগঠনের আয়োজিত মোদিবিরোধী মশাল মিছিলে যাই। উল্লেখ্য, আমি যে ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম (ছাত্র গণমঞ্চ) সেটি এই ৯ সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত না।

 

সেদিন মশাল মিছিল টিএসসি থেকে শুরু হয়ে জগন্নাথ হল, পলাশী, নীলক্ষেত হয়ে ভিসি চত্বরের সামনে দিয়ে আবার টিএসএসসি অভিমুখে রোকেয়া হলের বিপরিতে এসে শেষ হয়। মিছিলটি আর এগোয়নি কারণ সামনে ছাত্রলীগ লাঠিসোটা নিয়ে মানব দেয়াল তৈরি করে রেখেছিল। এরপর প্রগতিশীলদের মিছিলের জমায়েতটি কয়েকভাবে বিভক্ত হয়ে যায়। ফেরার পথে জনা পঞ্চাশের একটি বড় দল ভিসি চত্বরের দিকে হাটতে থাকে ছাত্রলীগের হামলার আশঙ্কায়। তারা ভিসি চত্বরের স্মৃতি চিরন্তনের চারপাশে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে নিজেদের মতো ২-৪ জন করে বসে কথা বলছিল।

 

হঠাৎ সাড়ে ৭টার দিকে ছাত্রলীগ তাদের মিছিল নিয়ে হেলমেট পরে আন্দোলনকারীদের  পিছু নিয়ে ভিসি চত্বরে আসে। ছাত্রলীগের একটি দল স্মৃতি চিরন্তনে ফুল দিতে যায় এবং অন্য একটি দল ফুলার রোডের দিকটায় এসে দাঁড়ায় লাঠিসোটা নিয়ে। এ সময় বাম প্রগতিশীলদের একটি দল হামলার আশঙ্কায় দ্রুত ওই এলাকা ছাড়ে। ছাত্রলীগের মিছিলটি ফুলার রোড ও ভিসি চত্বরের ফুটপাতে থাকা সাধারণ পথচারীদের জেরা করে এবং লোকজনকে এলোপাতাড়ি লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে। তখন ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এক কমলা হেলমেটধারী নেতা, রঙটাকে গ্লসি গেরুয়াও বলা যায়।

 

আমি স্মৃতি চিরন্তনি থেকে এই দৃশ্য দেখে জটলার মধ্যে কী হচ্ছে দেখার জন্য দ্রুত ক্যামেরার ভিডিও অন করে, বুকের কাছে হাত রেখে এগিয়ে যাই। এই সময় লাঠি ও ছাত্রলীগের প্ল্যাকার্ড হাতে এবং হেলমেট পরিহিত অবস্থায় মারামারি করছে এমন বেশ কিছু দৃশ্য আমার ক্যামেরায় ধরা পড়ে। মাত্র ৩০ সেকেন্ডের কিছু বেশি সময় ভিডিও চলার পরই হামলাকারীদের একজন আমাকে লক্ষ্য করে। তিনি আমাকে চার্জ করে ‘ওই মিয়া ওই, ভিডিও করেন ক্যা’। আমি আত্মরক্ষার জন্য বলি ‘সাংবাদিক’, কারণ আমি কখনো অন ডিউটিতে আন্দোলনে যাই না।

 

তারা এগিয়ে এসে আমার মোবাইল ছিনতাইয়ের (ছিনতাই বলব কারণ তাদেরকে বহিরাগত ছাত্রলীগ মনে হয়েছে) চেষ্টা করে। এরপর তারা আমাকে লাঠিসোটা দিয়ে পেটাতে থাকে। তারা এতটাই উগ্র ছিল এবং এতজন ছিল যে আমার মনে হয়েছিল, আমার একার পক্ষে বের হওয়া

মুশকিল এখান থেকে। তাই আমি একটা সময় দুহাত উচিয়ে চিৎকার করে বলে ফেলি ‘আয় মার, দেখি কতো মারতে পারোস’। পরে তাদের নেতারা পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে ভাড়াটে সেনাদের ফিরিয়ে নেয় এবং আন্দোলনকারীরা আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে

পাঠায়।

 

হাসপাতাল থেকে আমার শরীরে নির্যাতনের ছবি তুলে কয়েকজন সহযোদ্ধা ফেসবুকে দিয়ে প্রতিবাদ জানান। এরপর দৃকের হাবিবুল ভাইয়ের ছবিটিও চলে আসে ফেসবুকে, আমি নিজেও সেগুলো দিয়ে ওই ঘটনায় ছাত্রলীগ ও সরকারের সমালোচনা করে স্ট্যাটাস দেই। যা বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি রীতিমতো ভাইরাল হয়।

 

এই ঘটনার পরদিন অফিসে ২৬ মার্চের ছুটি ছিল, আমিও বিশেষ দিবসের ডিউটি করিনি। ২৭ মার্চ দুপুরে অফিসের অ্যাডমিন থেকে ফোন করে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘কী গ্যাঞ্জাম হয়েছে?’। দীর্ঘদিন কাজ করার সূত্রেই এমন অনানুষ্ঠানিক ভাই-বেরাদারের মতো প্রশ্ন। আমি ভেবেছিলাম আমার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিচ্ছে। ছাত্রলীগের হামলার কথা জানানোর পর এডমিনের ওই কর্মকর্তা বললেন, ‘ও এই কারণেই রাসেল (সম্পাদক, জুলফিকার রাসেল) ভাই আপনারে টার্মিনেট করছে। তিনি ফোন করে বলছেন আপনি এই মাসটাই (মার্চ) আছেন বাংলা ট্রিবিউনে।’ আমি আমার ২ মাসের নোটিশের কথা জানাতে চাইলে পরবর্তীতে তিনি জানান আমাকে আগামী দুই মাসের বেতন দেওয়া হবে। সাধারণ বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া বাংলা ট্রিবিউন ২ মাসের নোটিশ পিরিয়ড দেয়।

 

আমি মনে করি ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় বাংলা ট্রিবিউন আমাকে টার্মিনেট করে মূলত ছাত্রলীগকে লাল গোলাপ দিয়েছে, যা ক্ষমতাসীনদের তোষণেরই সামিল।

 

সংবাদমাধ্যমগুলো বাক স্বাধীনতার কথা বলে নিজেরাই আবার টুঁটি চেপে ধরে। আর এতে রসদ দিচ্ছে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’। কথিত ‘স্বনির্বাচিত’ সরকারের এই কালো আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এর প্রতিরোধ করতে হবে। এই আইন সরকারের সমালোচকদেরকে দমনের হাতিয়ার, যা ফ্যাসিবাদের প্রকাশ।

 

অনেক চাপের মধ্যেও এখানকার সাংবাদিকরা সত্যটা তুলে ধরার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমরা ভারতের মতো এখানেও গদি মিডিয়ার উলঙ্গ-উদোম বিচরণ দেখতে চাই না।

 

সংবাদমাধ্যমগুলোর গণমাধ্যম হয়ে ওঠা জরুরি, এটি সাংবাদিকদের নিজেদের গ্রহণযোগ্যতার জন্যই জরুরি।

 

 

নাঈম সিনহা একজন ভুক্তভোগী

সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট।