সোমবার ১৯শে আষাঢ় ১৪২৯ Monday 4th July 2022

সোমবার ১৯শে আষাঢ় ১৪২৯

Monday 4th July 2022

আন্তর্জাতিক মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা গণমাধ্যমের জালিয়াতি

২০২২-০৩-০২

নির রোজেন
তর্জমা : ইরফানুর রহমান রাফিন

মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা গণমাধ্যমের জালিয়াতি

মূল লেখার প্রকাশকাল: ১৮ মে ২০১১, আল-জাজিরা
প্রায়শই, আপনারা মূলধারার গণমাধ্যমের ভোক্তারা একটা জালিয়াতির শিকার হন। আপনারা মনে করেন, যে-নিবন্ধগুলো আপনারা পড়ে থাকেন সেগুলোকে আপনারা বিশ্বাস করতে পারেন – আর না পারারই বা কী আছে? আপনারা মনে করেন মতাদর্শিক পক্ষপাত একপাশে সরিয়ে রেখে আপনারা শুধু তথ্যগুলো টুকে নিতে পারেন। কিন্তু আপনারা জানেন না, যে-পণ্যের খরিদ্দার আপনারা, তাতে কী কী উপাদান মেশানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সমকালীন ঘটনাবলীর ব্যাপারে কীভাবে জ্ঞান উৎপাদন করা হয়, এই জ্ঞানের ওপর নির্ভর করার আগে, তা জানাটা জরুরি। এমনকি যে-সব ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে কোনো মতাদর্শিক পক্ষপাত নেই বলে মনে হয়, যেমনটা ইজরায়েল বিষয়ক কোনো প্রতিবেদন পড়ার সময় অনেকেই দেখতে পাবেন, জ্ঞানতাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত পর্যায়ে মৌলিক সমস্যা থেকে গেছে। এগুলো বিকৃতি তৈরি করে, মিথ্যাচার ঘটনায়, ও ক্ষমতাবানদের বয়ানকে বৈধতা দেয়।

 

পশ্চিমা বিদ্বৎসমাজ আর গণমাধ্যম কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যকে বর্ণনা করে তা আলোচনা করতে গিয়ে, ফরাশি বুদ্ধিজীবী ও পণ্ডিত ফ্রাজোয়া বুগাত অভিযোগ করে বলেছেন, পশ্চিমা আধিপত্যে থাকা ‘অপরকে’ ব্যাখ্যা করাটা দুই ধরণের বুদ্ধিজীবীর কাজ। এক, তিনি এবং আরেক দার্শনিক বর্দু যাকে নেতিবাচক বুদ্ধিবাচক বলেছেন, যারা নিজেদের বিশ্বাস আর অগ্রাধিকারগুলো রাষ্ট্রের বিশ্বাস আর অগ্রাধিকারের সাথে গুলিয়ে ফেলে, এবং যাদের দৃষ্টিকোণটা ক্ষমতার স্বার্থগুলোর সেবা করা ও এর ঘনিষ্ঠতা লাভ করাতেই নিবদ্ধ থাকে। আর দুই, যাদের যাদেরকে বলেন ‘নকল বুদ্ধিজীবী’, সমাজে যার ভূমিকা হচ্ছে ‘অপরের ব্যাপারে’ পশ্চিমা অডিয়েন্স ইতোমধ্যেই যেসব বিশ্বাস, ধ্যানধারণা, পূর্বানুমান, আর বর্ণবাদ ধারণ করে সেগুলো নিশ্চিত করা। মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর জন্য যেই সাংবাদিকেরা লেখালিখি করেন, তাদের সাথে আলোচনায় অংশ নেয়া ব্যক্তিবর্গসমেত, প্রায়ই এই দুই বর্গেই পড়েন।

 

ধ্রুপদী, উদার অর্থে সাংবাদিকতা ও সে বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা, আর বাস্তবতা সঞ্চারিত করার মত সুপরিচিত যে-সব বুলি আউড়াতে পছন্দ করে; তার অসম্ভাব্যতা নিয়ে একটা বিশাল সাহিত্যের অস্তিত্ব রয়েছে। যা-হোক, আর সম্ভবত বৈধতার বিকল্প উৎসের একটা অভাবের কারণেই, পশ্চিমের মূলধারার গণমাধ্যম আউটলেটগুলো এসব ধারণার ওপর ক্রমবর্ধমানভাবে জোর আরোপ করে থাকে। পশ্চিমা গণমাধ্যমের নিজের ব্যাপারে ও তার ভবিষ্যতের ব্যাপারে জানার জন্য ব্যতিক্রমবিহীনভাবে উপযুক্ত একটা জায়গা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। এর কারণ হল, এই সেই দৃশ্য, যেখানে বস্তুনিষ্ঠতা, ক্ষমতার ব্যাপারে নিরপেক্ষতা আর ক্রিটিকালি যুক্ত হওয়ার সব ভান দৃশ্যমানভাবে ভেঙে পড়েছে।

 

অপরকে কাঠামোবদ্ধ করা

 

যে-মতাদর্শিক হাতিয়ারগুলো কৃষ্টিকালচার তৈরি করে ও জ্ঞান উৎপাদন করে সাংবাদিকরা হচ্ছেন তাদের ছাঁচ। তাদের কাজ হচ্ছে, একটি কর্তৃত্ববিরোধী ও বিপ্লবী মতাদর্শ বা তাদের নির্দিষ্ট কাজের ক্ষেত্রে বয়ান তৈরি করার চেয়ে একটা শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করা এবং আধিপত্যশীল মতাদর্শকে বাঁচিয়ে রাখা। তারা হলেন শাসক শ্রেণির জৈবিক বুদ্ধিজীবী। জনগণ বা শ্রমিক শ্রেণিকে ভাষা দেয়ার বদলে, প্রায়শই সাংবাদিকরা একটা বুর্জোয়া শাসক শ্রেণির কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হন। তারা ব্যবস্থার স্বপক্ষে ও এর মূল্যবোধগুলোর পুনরুৎপাদন বজায় রাখতে কৃষ্টিকালচার তৈরি করেন ও প্রচার করেন। তারা এসব মূল্যবোধকে কৃষ্টিকালচারের ক্ষেত্রটাকে কর্তৃপক্ষবান্ধব করে তুলতে দেন আর যেহেতু আজকের দিনের সাংবাদিকতার একটা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অর্থনীতি আছে, তারা সব কর্তৃত্ববাদী বয়ান আর পয়সাঅলা শ্রেণির পণ্যে পরিণত হয়েছে।

 

শ্রমিক শ্রেণির কোনো নেটওয়ার্ক নাই, আর এই কথাটা হলিউড ও টেলিভিশনের বিনোদন ও সিরিজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য; (কারণ) একই বুদ্ধিজীবীরা এসব বানিয়ে থাকেন। এমনকি যেই সাংবাদিকরা সিরিয়াস হওয়ার ভাব ধরেন, তারাও সাধারণত কেবল অভিজাত শ্রেণিরই সেবা করে থাকেন, আর সামাজিক আন্দোলনগুলোকে উপেক্ষা করেন। সাংবাদিকতা যেন হয়ে গেছে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক একটা ব্যাপার, নির্বাচন, প্রতিষ্ঠান, প্রথাগত রাজনীতির ওপর যার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে। তর্কবিতর্ক, অপ্রথাগত রাজনীতি, আর সামাজিক আন্দোলনগুলোকে উপেক্ষা করে চলেছে সাংবাদিকতা।

 

সাহসী যুদ্ধ সাংবাদিক হিশাবে যাদের খ্যাতি আছে, যারা সারা দুনিয়ায় টো টো করে ঘুরে বেড়ান, ইয়েমেন থেকে আফগানিস্তান সংঘাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তারাও সচরাচর আমেরিকানদের বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গিটাই নিশ্চিত করে থাকেন। সাংবাদিকতা সরলীকৃত করে, অর্থাৎ এটা বিইতিহাসীকৃত করে। মধ্যপ্রাচ্যে সাংবাদিক প্রায়শই উপস্থাপনের একটা সহিংস কাজ। পশ্চিমা সাংবাদিকরা বাস্তবতাকে ধরে খোঁড়া করে দেন, এটাকে বিকৃত করেন, এবং একটা পূর্বনির্ধারিত বয়ান বা শ্রেণিবিন্যাসে খাপ খাওয়ান।

 

মার্কিন গণমাধ্যম সবসময়ই অঞ্চলটির ঘটনাবলিকে একটা মার্কিন বয়ানে খাপ খাওয়াতে চায়। সম্প্রতি ওসামা বিন লাদেনকে আততায়িত করার ঘটনাটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পরস্পরের পিঠ চাপড়ানোর মধ্য দিয়ে বরণ করে নেয়া হয়েছিল। অথচ মধ্যপ্রাচ্য এমন একটি জায়গায় যেখানে লাদেন সবসময়ই অপ্রাসঙ্গিক ছিলেন। কিন্তু আমেরিকানদের জন্য প্রাসঙ্গিক তিনি, আর তাই মার্কিন গণমাধ্যমের জন্য এটা ছিল এক ঐতিহাসিক ও সীমানির্দেশকারী মুহূর্ত, যা পাল্টে দিয়েছে সবকিছু। প্রায়শই পশ্চিমের সাথে যোগাযোগ মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলিকে প্রভাবিত করেছে, কিন্তু কথিত আরব বসন্ত ও এর বিপ্লব ও রদবদলগুলো শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদেরকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। বাদামি লোকেরা নিজেরাই নিজেদের মুক্তি আনতে পারছে, এই ব্যাপারটা তাদেরকে অস্বস্তিতে ভরে তোলে। যা-হোক, আরব বসন্ত হয়তো আরব বিশ্বের একটা বিপ্লবী রূপান্তরের প্রতিনিধিত্ব করে, যা ইসলামপন্থী রাজনীতির ওপর একটা বিশাল আঘাত, আর যা ইহজাগতিক ও বামপন্থী আরব জাতীয়তাবাদী রাজনীতির রেনেসাঁ।

 

কিন্তু মার্কিন গণমাধ্যম সবসময়ই ইসলামপন্থীদের নিয়ে ঘোরগ্রস্ত ছিল, সব সমাবেশের অন্তরালেই যাদেরকে সে খুঁজে বেড়ায় এবং (অত্র অঞ্চলের) অভ্যুত্থানগুলোকে প্রায়শই হুমকি হিশাবে দেখা হয়। আর প্রায়শই, পুরো ব্যাপারটা “ইজরায়েলের নিরাপত্তার জন্য এটা কী মানে রাখে?”-তে নেমে আসে। লক্ষ লক্ষ স্বাধীনতাকামী আরবের আকাঙ্খা ৫০ লাখ ইহুদিদের নিরাপত্তা চিন্তার অধীনস্ত থাকে যারা ফিলিস্তিনকে উপনিবেশায়িত করেছে।

 

মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রতিবেদনের পেছনে উগ্রজাতিবাদ আর জাত্যাভিমানের একটা শক্তিশালী উপাদান কাজ করে। আমেরিকান সৈনিকদের মত, আমেরিকান্ সাংবাদিকরাও নানান উপলক্ষ্যে স্থানীয় শব্দ ব্যবহার করতে পছন্দ করেন, এটা দেখাতে যে তারা সংস্কৃতির গোপন চাবিকাঠি খুঁজে পেয়েছেন।ওয়াস্তা হচ্ছে এমন একটা শব্দ। ইরাকে এক আমেরিকান ব্যুরো চিফ আমাকে বলেছিলেন, মুকতাদা আল সদরের অনেক ওয়াস্তা আছে, আর তাই তিনি দেশটিতে মার্কিন অবস্থানটা দীর্ঘ হওয়া ঠেকিয়ে দিতে পারবেন। এরকম আরেকটি শব্দ হচ্ছে ইনশাল্লাহ। আর আফগানিস্তানে এটা হচ্ছে পশতুনওয়ালি, আফগানদের বোঝার গোপন রহস্য। ইসলামকেও বিবেচনা করা হয় একটা কোড হিশাবে, যাকে আনলক করা যাবে, আর তারপর স্থানীয়দেরকে বোঝা যাবে – যেন বা তারা শুধু ইসলাম দ্বারা পরিচালিত হয়।

 

আরব কৃষ্টিকালচার আর ইসলাম নিয়ে এমনভাবে বাতচিত করা হয় যেমনটা একদা ভারত আর আফ্রিকা নিয়ে আলাপ করার সময় বর্ণ নিয়ে করা হত। আরব আর মুসলমানদেরকে ভালোমানুষ হিশাবে প্রদর্শন করাটা খুবই কঠিন, যতোক্ষণ না তারা “আমাদের মত” হয়ে ওঠে, গুগলের নির্বাহী ও অন্য অভিজাতদের মত ইংরেজি বলে, জমকালো পোষাক পরে, আর ফেসবুক ব্যবহার করে। তাই ধরে নেয়া হয় এরাই বিপ্লবের প্রতিনিধি। অন্যদিকে যেসব গরিব, শ্রমিক, নিম্নবর্গ, আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের টুইটার অ্যাকাউন্ট দূরে থাক ইন্টারনেটেই প্রবেশের সুযোগ নেই, তাদেরকে স্রেফ উপেক্ষা করা হয়। আর তিউনিসিয়া ও বিশেষত মিসরে বিপ্লবকে যাতে হুমকিস্বরূপ মনে না হয়, সে-জন্য অহিংস কর্মকৌশলগুলোর ওপর আলোকপাত করা হয়, আর সরকারি নিপীড়ণের বিরুদ্ধে সহিংস প্রতিরোধের বহু নজির সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে যাওয়া হয়। এটা শুধুই সাংবাদিকদের দোষ নয়। এটা সেই আমেরিকান বয়ান দ্বারা তাড়িত যা নিউ ইয়র্ক আর ওয়াশিংটনে বসে থাকা সম্পাদকদেরকে পরিচালিত করে।

 

আমি গত আট বছরের বড় অংশটাই ইরাক, সোমালিয়া, আফগানিস্তান, ইয়েমেন আর মুসলিম বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে কাটিয়েছি। তাই আমার সব কাজই সম্পন্ন হয়েছে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ছায়ায় আর বস্তুত এই যুদ্ধের কারনেই সেগুলো সম্ভবপর হয়েছে, এমনকি এই যুদ্ধের মূল ভিত্তিগুলোকে খারিজ করতে আমার তাবৎ পরিশ্রম সত্ত্বেও। একদিক থেকে বললে, আমার কাজ এতকিছুর পরও অই বয়ানটাকেই সমর্থন যুগিয়েছে। একবার আমি দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে আমার সম্পাদককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মুসলিম বিশ্বের বাইরের কোনো বিষয়ে আমি লিখতে পারি কিনা। তিনি জবাবে বলেছিলেন, আমি যদি স্প্যানিশ ভাষায় দক্ষ আর লাতিন আমেরিকা বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞও হই, জিহাদ নিয়ে না লিখলে আমার লেখা ছাপা হবে না।

 

বিচ্ছিন্নতা আর সংকীর্ণ বয়ানগুলো

 

সাংবাদিকরা কোন পরিবেশে বাস করে; (সংবাদ) পরিশ্রুত করা আর (দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে) মধ্যস্ততা করার জন্য কোনো কোন আলাপচারী, অনুবাদক, আর মাতবরের ওপর নির্ভর করে; সেটা আমাদেরকে বুঝতে হবে। ইরাক থেকে প্রতিবেদন করার ব্যাপারে যে-সব জনপ্রিয় অতিকথা চালু আছে তার মধ্যে একটি হল সাংবাদিকরা গ্রিন জোনে থাকে। এটা সেই দেয়ালঘেরা দুর্গসম লোকালয় যেখানে একসময় আমেরিকান দখলদাররা থাকত। এখন থাকে ইরাকি সরকার আর কিছু বিদেশি দূতাবাস। এটা সত্য নয়। দখলদারিত্বের পুরো পর্বটা জুড়ে, কোনো সাংবাদিকই আসলে গ্রিন জোনে থাকেন নি। তারা তাদের নিজেদের বানানো গ্রিন জোনে থেকেছেন, তা সেটা নিরাপদ প্রাঙ্গনই হোক আর বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রিন জোনই হোক। বাগদাদের প্যালেস্টাইন হোটেল আর শেরাটন হোটের চারধারে গড়ে ওঠা দুর্গটি ছিল সাংবাদিকদের জন্য প্রথম গ্রিন জোন। শুরুর দিকে আমেরিকান সৈনিকরা এটা পাহারা দিত, পরে ইরাকি নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের জায়গাটা নেয়। শিগগিরই দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস তার নিজের বিশাল দুর্গের নির্মাণ কাজ শুরু করল যার অংশ ছিল প্রহরী কুকুর, চৌকি মিনার, নিরাপত্তীরক্ষী, বিশাল সব দেয়াল, যানবাহন তল্লাশি। বিবিসি, এসোসিয়েট প্রেস ও অন্যরা এনওয়াইটির পদাঙ্ক অনুসরণ করে। তারপর ছিল হামরা হোটেল প্রাঙ্গন, ২০১০ সালে এক বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে বহু ব্যুরোই যেখানে থাকত। সিএনএস, ফক্স, আল জাজিরা ইংলিশের নিজস্ব গ্রিন জোন আছে, যদিও আমার মত ফ্রিল্যান্সাররা চাইলে সেখানে কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকতে পারে। আর একটা শেষ গ্রিন জোন আছে, যেটা হচ্ছে কুর্দি পেশমেরগা বাহিনী কর্তৃক সুরক্ষিত একটা বিশাল লোকালয়, যেখানে মধ্যবিত্ত ইরাকিরা আর কিছু সংবাদ ব্যুরো থাকে।

 

নীতিগতভাবে, একটা নিরাপদ প্রাঙ্গনে বাস করায় দোষের কিছু নেই। যুদ্ধক্ষেত্রে আর কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোতে বিদেশিরা প্রায়শই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বলে বিবেচিত হয়। আপনি যদি রাতে নিশ্চিতে ঘুমাতে যেতে চান, এই ভয়ে না থেকে যে কিছু লোক আপনার ঘরে ঢুকে পড়বে এবং আপনাকে বাইরে ছুঁড়ে ফেলবে, অথবা আপনি যদি জামা না ছেড়েই ঘুমাতে চান যাতে একটা গাড়ি বোমা হামলার ক্ষেত্রে আপনাকে ধবংসস্তূপের নিচে বিবস্ত্র দশায় ঘুমন্ত অবস্থায় পাওয়া না যায়। আপনি মানসম্মত খাবার খেতে চান, কলের জল ব্যবহার করতে চান, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পেতে চান, ইন্টারনেট প্রবেশের সুযোগ পেতে চান, সহকর্মীদের সাথে বাতচিত করতে চান। একজন সাংবাদিককে স্থানীয় কোন গরিব লোকের মত বাস করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু স্থানীয় জীবনের অভিজ্ঞতা আপনার যত কম হবে, ততোই কম দক্ষতার সাথে আপনি আপনার কাজ করতে পারবেন, আর পাঠকদেরকে এই ব্যাপারটা বুঝতে হবে। দুনিয়ার যে-কোনো জায়গায় একজন ছাপোষা মানুষ সকালে কাজে যায় আর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসে। নিজের সামাজিক শ্রেণি, জাতিগত দল, লোকালয় বা শহরের বাইরের খুব কম লোককেই সে চেনে। সাংবাদিক হিশাবে, আপনি একটা আস্ত দেশের ব্যাপারে রায় দিচ্ছেন আর সেটা সম্পর্কে অন্যদেরকে অবহিত করছেন; কিন্তু আপনি দেশটাকে জানেন না, কেননা আপনি প্রকৃতপক্ষে সেখানে থাকেন না। আপনি দিনে ২০ ঘন্টা দেশটা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকেন। রায়প্রদানের কোনো ভিত্তিই নেই আপনার, কারণ আপনার চোখে ইরাক হচ্ছে অই দূরে অবস্থিত কিছু একটা, রেড জোন, যাচাইবাছাইয়ের গতি এটাকে কঠিনতর করে তুলতে পারে।

 

অধিকাংশ মূলধারার সাংবাদিকই ২০০৪ সাল থেকে ইরাকে প্রতিবেদন করাটাকে একটা সামরিক অপারেশনের মত করে নিয়েছেন: প্রচুর পরিকল্পনা করে নির্দিষ্ট কিছু মিশনে বের হওয়া, একটা সাঁজোয়া যান, ব্যাকআপের জন্য একটা চেজ কার, ঢুকছেন বেরোচ্ছেন, সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন, এবং নিজেদের একান্ত গ্রিন জোনে ফিরে আসছেন। অথবা এমনকি আসল গ্রিন জোনেও প্রায়ই ঘুরে আসছেন তারা, যেখানে কর্মকর্তাদের সাথে মোলাকাত করা ও তাদের সাক্ষাৎকার নেয়া সহজ। যেখানে আপনি একটা পানীয় উপভোগ করতে করতে, কূটনীতিকদের সাথে আড্ডা জমাতে পারেন, এবং মাচো অনুভব করতে পারেন এই ভেবে যে আপনি রেড জোনে বাস করছেন। কিন্তু তাদের কৃত্রিম গ্রিন জোনগুলোতেও তারা জীবন থেকে সুরক্ষিত থাকেন – ইরাকিদের থেকে তো বটেই, সহিংসতা থেকেও।

 

তারা এমনিই ঘুরে বেড়ান না, বসেন না রেস্তোরাঁ মসজিদ আর হুসেইনিয়াগুলোতে, লোকের গৃহে, বস্তির ভেতর দিয়ে হেঁটে যান না, দোকানদারি করেন না স্থানীয় বাজারে, রাতের বেলা হাঁটাহাটি করেন না, শরবতের দোকানে বসেন না, ঘুমান না সাধারণ মানুষের ঘরে, গ্রামে যান না, ক্ষেতখামারে যান না, এবং যতোটা পারা যায় একজন ইরাকি হিশাবে ইরাকের অভিজ্ঞতা লাভ করেন না। এর মানে হল রাতের বেলা জীবনটা কেমন, গ্রামের দিকে জীবনটা কেমন, কোন কোন সামাজিক চল গুরুত্বপূর্ণ, কোন গানগুলো জনপ্রিয়, কোন ঠাট্টাগুলো করা হচ্ছে, রাস্তায় কি নিয়ে বাহাস চলছে, লোকে কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, বাঁ রাতের বেলা কোন ধরণের ইরাকিরা বারে যায় – এসব ব্যাপারে তাদের কোনো ধারণাই নাই। এমনিই ঘুরে বেড়ানোতেই নিহিত আছে সমস্যার সমাধান। আপনি স্রেফ পর্যবেক্ষণ করবেন, আপনার প্রতিবেদন কেমন হবে সেটা ঘটনাপ্রবাহ আর জনসাধারণকে নির্ধারণ করতে দেবেন। তারা অনুসন্ধান চালায় না, স্বতঃস্ফূর্ত লিড টুকে নেয় না, বিশ্বস্ত যোগাযোগ আর সূত্রের একটা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে না। সময়ের সাথে সম্পদ আর আগ্রহ কমে আসতে থাকার মানে হল ব্যুরোগুলোকে হয় কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে হয়েছে, নয় কর্মী ছাঁটাই করতে হয়েছে, এবং শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ উপলক্ষ্যেই তারা একজন সাংবাদিককে কয়েকজন কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নিতে পাঠায় যারা সাক্ষাৎকার নেয়া শেষ করেই বাড়ি ফিরে যায় ।

 

সমাজের বুনটের ক্ষেত্রে ছলচাতুরির আশ্রয় নেয়া

 

আর যেহেতু তারা আরবি জানেন না, তারা একেবারে আক্ষরিক অর্থেই দেয়াললিখন পড়তে পারেন না – দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিগুলো – সেগুলো কী মুজাহিদিনদের জন্য লেখা হয়েছে, মুকতাদা আল সদরের জন্য, নাকি মাদ্রিদ বা বার্সেলোনার ফুটবল টিমের জন্য। এর মানে হল, তারা যদি একজন ব্যক্তির সাথে কথা বলেন, অনুবাদক শুধু সেই লোকটা কী বলছে তাই তাকে জানায়। আশেপাশে অন্যরা কী বলাবলি করছে তা নয়। তারা বাহরাইনের শিয়াদের সমর্থনে গাওয়া সদরপন্থী গানগুলো শুনতে পায় না, বা শুনতে পায় না সেই ট্যাক্সি ড্রাইভারের কথাও যে অভিযোগের সুরে বলছে কতই না ভালো ছিল সাদ্দাম আমল, বা আজ সকালে দেখা আক্রমণগুলো নিয়ে আলোচনা করছে, বা চেকপয়েন্টে ঠাট্টামশকরা করা সৈনিকদের কথা, বা সেই দোকানির কথা যে সৈন্যদেরকে গালিগালাজ করছে। বস্তুতা তারা তো ট্যাক্সি বা বাসও নেন না, তাই জনগণের সাথে সহজাত আলাপের সুযোগ তারা হারান। এর মানে হল তারা লোকের ঘরে হাতপা ছড়িয়ে বসে পারিবারিক আলোচনা, কার কী নিয়ে মাথাব্যথা, সেসব শুনতে পান না। জার্মানরা যেটাকে ফিঙ্গারস্পিতজেনগেফুহল বলে, আঙুল দিয়ে টিপে পরখ করে দেখা, তারা কখনোই সেই অনুভূতিটা গড়ে তুলতে সমর্থ হন নি। গড়ে তুলতে সমর্থ হন নি সেই স্বজ্ঞামূলক বোধ, যা মানুষকে বলে দেয় চারপাশে কী হচ্ছে, চল আর অনুভূতিগুলো কী কী – আর এই বোধ মানুষ সমাজের বুনটের ভেতর দিয়ে আঙুল চালানোর মধ্য দিয়েই কেবল অর্জন করতে পারে।

 

আরব বিশ্বের এক শিক্ষার্থী একদা মন্তব্য করেছিলেন, কোন স্ব-নিযুক্ত সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞকে শুরুতে উম্মে কুলসুম পরীক্ষায় পাশ করতে হবে – এর মানে হচ্ছে, সে কি উম্মে কুলসুমের নাম শুনেছে, যিনি কিনা আরব জাতীয়তাবাদের আইকনিক মিশরীয় ডিভা, যার গান আর কথা আজো সারা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে প্রতিধবনিত হয়? যদি না শুনে থাকে, তাহলে নিঃসন্দেহে আরব সংস্কৃতির সাথে তার কোনো পরিচয়ই নেই। এই পরীক্ষার ইরাকি সংস্করণ হতে পারে হাওয়াসিম পরীক্ষা । সাদ্দাম হোসেন ইরাকের বিরুদ্ধে (পশ্চিমা দেশগুলোর) ১৯৯১ সালের যুদ্ধকে বলেছিলেন উম্মে মারিক, বা সব সমরের মা। আর ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধকে তিনি উম্মে হাওয়াসিম হিশাবে অভিহিত করেন, যার মানে হল সব নির্ধারক মুহূর্তের মা। দ্রুতই দেখা গেল, আগ্রাসনের পথ ধরে যে লুটপাট শুরু হল, ইরাকিরা তাকে হাওয়াসিম বলছে। আর শব্দটা একটা সাধারণভাবে ব্যবহৃত পদে পরিণত হয়েছে, যা দ্বারা শস্তা বাজার থেকে শস্তা পণ্য হয়ে চুরি যাওয়া দ্রব্য সবই বুঝায়। আপনি যদি বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালান, যেন কোনোকিছুতেই আপনার কিছু যায় আসে না, তাহলে আরেকজন গাড়িচালক হয়তো আপনার দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলবে, “পাইছসটা কী শালা, হাওয়াসিম?” যদি আপনি এই ধরণের সাংস্কৃতিক ঘটনাগুলোর সাথে নিজেকে পরিচিত করে তোলার প্রয়াসটুকু পর্যন্ত না নেন, তাহলে বাড়ি ফিরে যান।

 

একজন অনুবাদকের ওপর নির্ভরশীল থাকার মানে হল, আপনি একটা নির্দিষ্ট সময়ে শুধু একজন মানুষের সাথেই কথা বলতে পারেন, এবং এর ফলে ব্যাকগ্রাউণ্ডের সব আলাপ মিস করে যান। যার অর্থ দাঁড়ায়, আপনাকে একটা নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণি, বা সম্প্রদায়, বা রাজনৈতিক অবস্থান থেকে আসা কারো ওপর নির্ভর করতে হয় যিনি দেশটায় আপনার মধ্যস্ততাকারীর ভূমিকা পালন করবেন, এবং আপনার জন্য (সংবাদ) পরিশ্রুত করবেন। হয়তো সেই মানুষগুলো সুন্নী এবং নিজের কওমের বাইরে তাদের যোগাযোগ খুবই সীমিত। হয়তো তার পুর্ব বৈরুতের খ্রিস্টান, এবং দক্ষিণ লেবাননের শিয়া বা উত্তরের সুন্নীদের ব্যাপারে খুবই কম জানে তারা। হয়তো তারা শহরবাসী এবং গ্রামাঞ্চলে থাকা লোকজনের ব্যাপারে তাচ্ছিল্যের মনোভাব পোষণ করে। হয়তো তারা বাগদাদে বাস করা মধ্যবিত্ত শিয়া বাঁ সাবেক চিকিৎসক বা প্রকৌশলী যারা সদরীপন্থীদের বড় অংশ গরিব শহুরে শ্রেণির দিকে করুণার নজরে তাকান। আর তাই ২০০৩ সালের মে মাসে, প্রথম আমেরিকান সাংবাদিক হিশাবে আমি যখন মুকতাদা আল সদরের সাক্ষাৎকার নিতে চাই, সময় নষ্ট করছি বলে এবং তাকে না জানিয়েই নিউ ইয়র্কের সম্পাদকদের কাছে সাক্ষাৎকারটা পাঠিয়ে দিয়েছি বলে, টাইম ম্যাগাজিনে আমার ব্যুরো চিফ আমার ওপর গোস্বা হয়েছিলেন। তার নজরে মুকতাদা ছিলেন গুরুত্বহীন, নামহীন গোত্রহীন। কিন্তু ইরাকে, সামাজিক আন্দোলন, রাস্তার আন্দোলন, মিলিশিয়া, তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষমতাবান, এরা সবাই তাদের চাইতে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যারা এস্টাবলিশমেন্টের অংশ, বা গ্রিন জোনে বসে থাকা রাজনীতিবিদ। আর রেড জোনের ঘটনাবলিই হচ্ছে তাই যা দেশটির সবকিছুকে গড়ন দেয়।

 

একটা দেশে কী হচ্ছে না হচ্ছে পূর্বপরিকল্পিত মিশনে গিয়ে আপনি সেটা বুঝবেন না। আপনি তখনই ব্যাপারগুলো বুঝতে শুরু করবেন যখন অপরিকল্পিত ঘটনা ঘটে। যখন আপনি কোন বন্ধুর মহল্লায় সময়টাকে উপভোগ করতে যান আর অন্য প্রতিবেশীরা সেখানে চলে আসে। একটা সাধারণ গাড়িতে করে ঘুরে বেড়ানোর সময়ই বিষয়গুলো বুঝতে পারবেন আপনি, শক্ত কাঁচ লাগানো সাঁজোয়া যানে করে নয়। কয়েক মাস আগে, রামাদির বাইরে এক চেকপয়েন্টের সৈন্যরা আমাকে বলল, তাদের এক সহকর্মীকে বাগদাদ পর্যন্ত লিফট দিতে হবে। লোকটা ছিল বসরার। আমরা যে-আলাপচারিতাটায় জড়িয়ে গেছিলাম, সেটার পাশাপাশি সবচে উন্মোচনমূলক যা ছিল তা হল, রামাদির বাইরের একজন সৈন্য এক অপরিচিতের কাছে লিফট চাইতে নিরাপদ বোধ করছে। অথচ অতীতে নিজের পরিচয়পত্র বহন করার সাহসও পেত না সে। এটাও উন্মোচনমূলক যে, নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মীর একজন সদস্যকে লিফট দিতে রাজি হয়েছে একজন পরিচিত। এরপর থেকে আমি অন্য ইরাকি সৈন্য আর পুলিশ সদস্যদেরকে লিফট দিয়ে আসছি।

 

শ্রেণি রাজনীতি

 

গত কয়েক বছর ধরে, ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীগুলো নিজেরাই দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম কিনা, সেই বিষয়ে নিবন্ধ প্রকাশের হিড়িক লেগেছে। কিন্তু এই নিবন্ধগুলোর ভিত্তি হয় মার্কিন আর না হয় ইরাকি কর্মকর্তারা। সাংবাদিকরা ইরাকি লেফটেন্যান্টদের সাথে কথা বলেন নি, কর্নেল আর সার্জেন্টদের সাথেও না। তারা এসব সূত্র তৈরি করেন না, তাদের সাথে বন্ধুত্ব পাতান না, অবসরে একসাথে পান করার দাওয়াত দেন নি, তাদের ঘরে তাদের পরিবারের সাথে বসেন নি।

 

তাই ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি, ইরাকের চেকপয়েন্টগুলোতে মানুষ যোগানো আর অভিযানে যাওয়া সৈন্য আর পুলিশ কর্মকর্তাদের মত, অলিখিতই রয়ে গেছে। তাদের সাথে সাক্ষাৎ হলে আপনি এটাও বুঝতে পারতেন যে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোতে সাম্প্রদায়িকতা কতটা কমে এসেছে, অন্যদিকে দুর্নীতি আর নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো ক্ষমতার অপব্যবহারগুলো একটা সমস্যা রয়ে গেছে। আর ২০০৯ সাল থেকে শুধু দেশটায় ঘুরে বেড়ালেই এই সত্যটা বেরিয়ে আসত যে, হ্যাঁ, ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীগুলো বর্তমান পর্যায়ের নিরাপত্তা (বা নিরাপত্তাহীনতা) বজায় রাখতে পারে কারণ তারা কাজটা সেই সময় থেকে করে আসছে, প্রত্যন্ততম গ্রামগুলোর চেকপয়েন্টগুলোতে মানুষ যোগাচ্ছে, নিজস্ব ইন্টিলিজেন্স সূত্রের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে, আর মোদ্দা কথাটা হল – ইরাক দখল করে নিচ্ছে। ইরাককে কোন মাত্রায় সামরিকায়িত করে তোলা হয়েছে তা যথেষ্ট পরিমাণে জানান হয় নি। কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীগুলো ইরাককে দখল করে চলেছে, আর একটা নিত্যদিনের নিরাপত্তা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মার্কিন উপস্থিতি মোটা দাগে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে।

 

আর সেখানে ছোট ছোট আবু ঘারিব গড়ে উঠেছে। আবু ঘারিব, বা আফগানিস্তানের “কিল টিমের” মত বড় মাপের স্ক্যান্ডালগুলো, সময়ের সাথে গনমাধ্যমে জায়গায় করে নেয়। সেখানে তাদেরকে খারাপ আপেল আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে বাতিল করে দেয়া হয় আর দখলদারিত্বের নিত্যনৈমিত্তিক নিপীড়ণকে উপেক্ষা করা হয়। কিন্তু দখলদারিত্বের মানেই হল একটা গোটা দেশে পদ্ধতিগতভাবে ও ধারাবাহিকভাবে সহিংসতা চাপিয়ে দেয়া। এর মধ্যে আছে সার্বক্ষণিক গ্রেপ্তার, প্রহার, হত্যা, অপমান, আর আতঙ্কিতকরণ। আর যদি না আপনি নিজেই এসবের অভিজ্ঞতা লাভ করেন, এই ব্যাপারগুলোকে বর্ণনা করা অসম্ভব। সর্বোচ্চ একটা তালিকা তৈরি করার চেষ্টা করা যায় যতক্ষণ না সেটা পাঠকের স্নায়ুকে অবশ করে দেয়। আমি আট বছরে মাত্র তিনবার এমবেডেড ছিলাম – দুইবার ইরাকে, প্রতিবার দশ দিন করে, আর একবার আফগানিস্তানে তিন সপ্তাহের জন্য।

 

ইরাকে আমি প্রথম এমবেডেড হই ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসে। দেশটিতে পা রাখার মাত্র ছয় মাস পরে। আমি ছিলাম আনবার প্রদেশে। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, সৈন্যরা হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করছে, গোটা গ্রামের সব লোককে ধরে এনেছে, কথিত সামরিক বাহিনীতে যোগ দেয়ার উপযুক্ত বয়সের পুরুষদেরকেও, এই আশায় যে, কেউ না কেউ (সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার ব্যাপারে) কিছু না কিছু জানবে। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, ছোট শিশুরা চিৎকার করে কাঁদছে তাদের বাবাদের জন্য, যেই লোকগুলোকে প্রহৃত, রক্তাক্ত আর আতঙ্কিত হতে দেখছে তারা, আর এই জীবনগুলোকে যখন ধবংস করা হচ্ছিল তখন সৈন্যরা হাসছে বা ধূমপান করছে বা বিজয়চিহ্ন দেখাচ্ছে একে অপরকে, বা পান চিবুচ্ছে, বা লনে থুতু ফেলছে। আমি জানতাম আমি যেসব লোককে গ্রেপ্তার হতে দেখেছি, তাদের একজন নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে, আর আরো অসংখ্যের শেষ ঠাঁই হয়েছে আবু ঘারিবে। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, কীভাবে বুড়ো লোকদেরকে সহিংসভাবে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছিল। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম নিরীহ মানুষদেরকে পেটানো হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তাদেরকে নিয়ে হাসাহাসি করা হচ্ছে, আর তাদেরকে অপমানিত করা হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে সেই আবু ঘারিব যা যে-কোনো দখলদারিত্বের সাথে আসে। তা সেই দখলদার যদি এমনকি সুইডেনের গার্লস স্কাউটও হয়।

 

বহু সাংবাদিক তাদের গোটা ক্যারিয়ারটাই এমবেডেড হিশাবে পার করে দিয়েছেন, মাসের পর মাস, বা এমনকি বছরও। তাই আমি যা দেখেছি সেটাকে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ আতঙ্কগ্রস্ত ট্রমাগ্রস্ত পরিবার, প্রহার, হত্যা, সেসব শিশু যারা তাদের বাবাকে হারিয়েছে আর প্রতি রাতে বিছানা ভিজিয়ে ফেলছে, সেসব নারী যারা তাদের পরিবারের ভাত জোটাতে পারছে না, চেকপয়েন্টে গুলি খাওয়া মাসুম মানুষেরা – এই সব দিয়ে গুন করুন। তাহলেই আপনি পেয়ে যাবেন সেই নিত্যদিনকার আবু ঘারিবগুলোকে যা একটি দখলীকৃত দেশে বাস করার সময় আপনি সহ্য করেন, বিশালাকার কংক্রিট দেয়ালের দঙ্গল পার হতে হতে, কাঁটাতার পেরোতে পেরোতে, চেকপয়েন্টে অপেক্ষা করার সময়, কনভয়গুলো কখন যাবে তার প্রতীক্ষায় থাকার সময়, সামরিক অপারেশগুলো কবে শেষ হবে ভাবতে ভাবতে, কারফিউ শেষ হওয়ার আশায় থাকতে থাকতে, সামরিক যান আপনার পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে, আপনার দিকে তাক করে রাখা হয়েছে ফিফটি ক্যালিবার মেশিনগান, তাক করে রাখা হয়েছে এমসিক্সটিন, পিস্তল, দীর্ঘদেহী বিদেশি সেনারা আপনার দিকে তাকিয়ে চেঁচাচ্ছে, আর আপনাকে হুকুম দিয়ে বেড়াচ্ছে। বা হয়তো আফগানিস্তানে, সামরিক কনভয় একটা খালের ওপর দিয়ে চলে গেল, আর কোন গ্রামের তিরিশটা পরিবারের সুপেয় পানির একমাত্র উৎসটা ধবংস হয়ে গেল। এখন আর তাদের জীবনধারণের কোন উপায় নেই। বা যখন তারা কোনো নিরীহ আফগানকে গ্রেপ্তার করে, কারণ লোকটা তার সেলফোনে তালেবান সঙ্গীত রেখেছিল – যেমনটা অনেক আফগানই রাখে – আর এখন তাকে আফগান কারাব্যবস্থায় ঢুকতে হবে।

 

কিন্তু যদি আপনি শ্বেতাঙ্গ হন আর শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান সৈন্যদের সাথে নিজের সাযুজ্য দেখেন, তাহলে আপনি এই বিষয়গুলো উপেক্ষা করতে পারেন। এগুলো আপনার সাথে ঘটবে না। তাই আপনার পাঠকদের সাথেও এগুলো কোনোদিনও ঘটবে না। ঠিক যেমন আপনি কখনোই ভেবে দেখেন না যে আপনার গড়পরতা ইয়েমেনি, বা মিসরীয় বা ইরাকি ভাইয়েরা কীভাবে তাদের নিজেদেরই নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে দৈনন্দিন ভিত্তিতে বোঝাপড়া করছে। না ভাবার কারণ, আপনি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখেন রাজনীতি আর নিরাপত্তার বনেদী পর্যায়ে, আর চেকপয়েন্ট আপনার গাড়িটাকে থামিয়ে দেয়া হয় না সঠিক ব্যাজগুলো ধারণ করায়। আপনি একটা সঠিক ব্যাজ ধারণ করেন বিধায় পুলিশ আপনাকে আটক করে না। যতক্ষণ না সরকারি গুণ্ডারা আপনাকে পিটিয়ে ছাতু বানিয়ে দিচ্ছে, যেমনটা তারা (মিসরে) করেছিল অ্যান্ডারসন কুপারের সাথে, এরকম কিছু হলেই কেবল আপনি মোবারকের (এখানে এটা প্রতীকী অর্থে বলা হয়েছে। - অনুবাদকের নোট) হিস্টেরিয়াগ্রস্ত প্রতিপক্ষে পরিণত হবেন এবং ন্যায্যতার জন্য ক্রুসেডে নামবেন। টেলিভিশন প্রতিবেদন সেলেব্রিটি সংবাদদাতাদের ব্যাপারে মাত্রাছাড়া রকমের রক্ষাপরায়ণ - এসব সংবাদদাতা কমই বাইরে বেরোন, তারা স্রেফ এমবেড হয়ে থাকেন - এবং তারা নিজেদের নিরাপদ প্রাঙ্গনের ভেতরে বসে সড়কের লাইভ চিত্র ধারণ করেন। শেষে দেখা যায়, সংবাদের বিষয়বস্তু আর সেই সংবাদটি থাকে নি, এটার সংবাদদাতার ব্যাপারে সংবাদে পরিণত হয়েছে। তারপর তারা সাংবাদিকের ও তার কাজের ব্যাপারে “গল্পের পেছনের গল্প” বলে এবং মূল ঘটনাটাই আড়ালে চলে যায়।

 

রবার্ট কাপলান, যাচ্ছেতাই একটা লেখক আর সাম্রাজ্যবাদের মহাসমর্থক, একবার মুখ ফসকে একটা ভালো কথা বলে ফেলেছিলেন। তিনি আমেরিকান সৈন্যদের সাথে মনোসেতু গড়তে না পারার দায়ে সাংবাদিকদের সমালোচনা করছিলেন, কারণ সাংবাদিকরা একটা অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে, আর সৈন্যরা সরকারি ইশকুলে পড়া গ্রামের এলাকাগুলো থেকে ও শ্রমিক শ্রেণি থেকে এসেছে (এই শব্দটা আমাদের উচ্চারণ করার কথা নয়, কেননা আমেরিকাতে সবাই নিজেকে মধ্যবিত্ত মনে করে)। কিন্তু এটাও সমানভাবে সত্য যে তারা দুনিয়ার কোথাও শ্রমিক শ্রেণির সাথে সহজভাবে মিশতে পারে না, আর এই কারণেই তারা ঝুঁকে পড়ে অভিজাতদের দিকে। অভিজাত আর কর্মকর্তাদের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখাটা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের কাভারেজের সমস্যা নয়, এটা একটা সাধারণ সমস্যা। অঞ্চলটি পরিদর্শনে আসা একজন আমেরিকান কর্মকর্তা অঞ্চলটির ব্যাপারে নিবন্ধ লেখেন, কিন্তু নিজস্ব প্রেক্ষিতে প্রত্যক্ষতাবাদী পদ্ধতিতে এটাকে অধ্যয়ন করা হয় না। জেনারেল হোক, প্রেসিডেন্ট হোক, আর মিলিশিয়া কমান্ডার হোক, ক্ষমতাবান মানুষেরা মিছা কথা বলবেই। এটা প্রথম নিয়ম। কিন্তু, খুব বেশি হলে, সাংবাদিকরা এমন ভাব ধরে যেন ক্ষমতাবানদের মধ্যে শুধু বাদামি মানুষেরা মিথ্যাচার করে, আর এই কারণে তারা শ্বেতাঙ্গদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির ওপর নির্ভর করে। সেই শ্বেতাঙ্গরা সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাই হোক কিংবা কূটনীতিক, ধরেই নেয়া হয় যে তারা বিশ্বস্ত। এই মনোবৃত্তির সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হচ্ছে বিন লাদেন হত্যাকাণ্ড। মূলধারার অধিকাংশ সাংবাদিকই মার্কিন সরকারের ফীডের ওপর অলসভাবে নির্ভর করছি আর তাদেরকে এমন একটা আনুষ্ঠানিক সংস্করণ একেবারে আক্ষরিক অর্থেই গুলিয়ে খাওয়ানো হচ্ছিল যা ঘন্টায় ঘন্টায় বদলায়। কিন্তু এই সবকিছুকেই বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল হিশাবে দেখা হয়।

 

বিপ্লবকে অবশ্য সম্প্রচার করতে হবে

 

গ্রিন জোন ছেড়ে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে সাংবাদিকদের যে-ব্যর্থতা তার একটা কারণ হয়তো স্বস্তিবোধে ব্যাঘাত ঘটাতে না চাওয়া আর আলসেমির একটা সংমিশ্রণ। কিন্তু ইরাক, আফগানিস্তান, অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ, আর কিছু দেশের সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে, আপনাকে আপনার আরামের ডেরা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে।  ছয় ঘন্টা ধরে ঝাঁকি খেতে খেতে ধুলোমলিন পথ দিয়ে গরমে ঘামতে ঘামতে কারো বাড়িতে গিয়ে মেঝেতে বসে অখাদ্য কুখাদ্য খাওয়ার চেয়ে আপনার হয়তো ইংরেজিভাষী হুইস্কি পানকারী রাজনীতিবিদদের সাথেই আসর জমাতেই বেশি ভালো লাগবে। কিন্তু নির্দিষ্ট পরিমাণ ডায়রিয়া সত্যের পথের সাথী।

যখন কোনো বাস্তব গ্রিন জোন থাকে না, সাংবাদিকরা সেটা তৈরি করে নেন। লেবাননে যেমন তারা হামরা, গুমায়জেহ, বা মনোতের গ্রিন জোনগুলোতে বাস করেন। যেগুলো সাংবাদিকদেরকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। তাদেরকে যথেষ্ট পরিমাণ এক্সোটিক আনন্দের সন্ধান দেয় যেন তারা অনুভব করতে পারেন যে তারা প্রাচ্যভূমিতে বাস করছেন। তাদের আর ত্রিপোলি, আক্রা, বেকা, বা বৈরুতের অধিকাংশ এলাকা বা লেবাননের বাকি অংশে যেতে হয় না যেখানে গরিব লোকেরা থাকে। অন্য দেশগুলোর মত, লেবাননি একজন  ডাকলেই হাজির হয়ে যাবে এমন মাতবর আর অনুবাদক মাফিয়া পাওয়া যায় যারা মূল্য নির্ধারণ করে, আর একজন সাংবাদিককে অনুমোদন দেয়, যেন তিনি সকল রাজনৈতিক গোষ্ঠীর একজন করে প্রতিনিধির সাথে মোলাকাত করতে পারেন। যেন তিনি ওয়ালিদ জুমব্লাতের সাথে মদ্যপান করতে পারেন এবং তার কখনোই-না-খোলা বইয়ের সংগ্রহে (এই বইগুলোর একটা আমি লিখেছি) এবং নিউ ইয়র্ক রিভিউ অফ বুকসের কখনোই-না-পড়া সংখ্যাগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করতে পারেন। তাহলেই তাকে আর যেতে হয় না বৈরুতের তারিক আল জাদিদা বা ত্রিপোলির বাব আল তাবানেহ-তে, হেঁটে যেতে হয় না কোন ফিলিস্তিন শরণার্থী শিবিরের ভেতর দিয়ে, আর দেখতে হয় না মানুষ কীভাবে বেঁচে আছে আর কী নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে।

 

একটা গ্রিন জোন হতে পারে রাজধানী শহর বা লোকালয় বা শুধু কর্মকর্তাদের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা, যতক্ষণ এটা আপনাকে বাস্তবতার, বা গরিবির, বা শ্রেণি সংঘাতের রেড জোন থেকে, আপনাদের মতাদর্শের প্রতি, স্বস্তিবোধের প্রতি চ্যালেঞ্জ থেকে আড়াল করে রাখবে। মিসরে, এমনকি বিপ্লবের আগেও, কায়রো গণমাধ্যমের মনোযোগের কেন্দ্রে থেকেছে। কিন্তু বিপ্লবের সময় সাংবাদিকরা তাহরির চত্বর ছেড়ে সামান্যই বেরিয়েছে। মিসরের জনসংখ্যা ৮৬ মিলিয়ন। এটা শুধু তাহরির না, শুধু কায়রো বা আলেকজান্দ্রিয়া না। সাইদ বন্দর আর সুয়েজ সামান্যই কাভারেজ পেয়েছে, যদিও বিপ্লবের অন্যতম স্ফূলিঙ্গ এই সুয়েজেই ছিল। লিবিয়াতে শুরুতে সবকিছুই নতুন ছিল আর সকলেই অনুসন্ধানকারী ও অভিযাত্রিক ছিলেন, কিন্তু বর্তমানে স্ব-নিযুক্ত বিরোধী নেতৃত্ব এই বার্তাটা দেয়ার চেষ্টা করছে যে আপনি অলসের মত বসে থাকতে পারেন আর কেবল তাদের দেয়া বিবৃতিগুলো পুনঃপ্রচার করতে পারেন। ইয়েমেনকে পুরোপুরি অবহেলা করা হয়েছিল, কিন্তু যখন শেষ পর্যন্ত তা মনোযোগ আকর্ষণ করল, তখনো তা কেবল সানা-কেন্দ্রিকই রয়ে গেল। আর ইয়েমেন রাজধানীর নিজস্ব একটা গ্রিন জোন তো আছেই, সেটা হল মোভেনপিক হোটেল, শহরের বাইরে নিরাপদ একটা জায়গায় অবস্থিত। এখন ইয়েমেনকে এমনভাবে দেখান হয় যেন সানায় দুইটা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী দল সমাবেশ করছে, যদিও অভ্যুত্থানগুলো অনেক আগেই - এবং অনেক বেশি সহিংস রুপে - শুরু হয়েছিল তায়েজে, এডেনে, সাদায়, এবং অন্যায় জায়গায়। ইয়েমেনকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রিজমের ভেতর দিয়ে দেখা হয়, আমেরিকান সরকারের প্রিজমের ভেতর দিয়ে দেখা হয়, জনগণের চাহিদা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রিজমের ভেতর দিয়ে নয়।

 

কিন্তু আপনি যদি সমাবেশগুলোতে কিছুটা সময় কাটেন, বুঝতে পারবেন ইয়েমেনে আল-ক্বায়েদা ও এর মতাদর্শ কতটা গুরুত্বহীন। তারা একটা নিবন্ধের বিষয়বস্তু হওয়ারও দাবি রাখে না। আর আপনি এটা মনে রাখলে ভালো করবেন, যে যদিও আল-ক্বায়েদার ইয়েমেনি ফ্র্যাঞ্চাইজিকে আমেরিকার জন্য বৃহত্তর হুমকিসৃষ্টিকারী বলে গণ্য করা হয়, একিউএপির রেকর্ড একজন ব্যর্থ অন্তর্বাসপরিহিত বোমাবাজ আর একটা ব্যর্থ প্রিন্টার কার্তিজ বোমার চেয়ে বেশি নয়।

 

পুরো তৃতীয় বিশ্ব জুড়েই আমেরিকান প্রতিবেদন সমস্যাজনক। কিন্তু আমেরিকান সামরিক/শিল্পায়িত/আর্থিক/বিদ্যায়তনিক/গণমাধ্যমিক জোটটা মধ্যপ্রাচ্যে এত সরাসরি জড়িয়ে আছে যে, এহেন বাজে প্রতিবেদনের পরিণত আরো বেশি উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে। এসবের ভেতর দিয়ে সাংবাদিকরা প্রোপাগাণ্ডিস্টে পরিণত হয়, যাদের কাজ নিরীহ মানুষ হত্যার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো, তাদের পাশে দাঁড়ানো নয়।

 

মধ্যপ্রাচ্যে বহু সাহসী ও একনিষ্ঠ সাংবাদিক আছেন যাদের কাজ মনোযোগ ও প্রশংসা দাবি করে। এদের কেউ কেউ মূলধারার গণমাধ্যমের জন্যও কাজ করেন। প্রায়শই তাদের স্বাধীন স্বরগুলোকে সেই গাদা গাদা লেখকের স্বরের নিচে ডুবিয়ে দেয়া হয় যারা ক্ষমতার বিরোধিতা করার বদলে তার পক্ষে সাফাই গান। আমাদের কাজ ক্ষমতার মুখের ওপর সত্য বলা না। যারা ক্ষমতায় আছে তারা ইতোমধ্যেই সত্যটা জানে, স্রেফ গায়ে লাগায় না। আমাদের কাজ জনতার মুখের ওপর সত্য বলা, যাদের ক্ষমতা নেই, যেন একদিন তারা ক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

 

মধ্যপ্রাচ্য শিক্ষাদান বিষয়ে জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত হওয়া জাদিলিয়ার স্পন্সরকৃত একটি সম্মেলনে দেয়া বক্তৃতার ভিত্তিতে এই নিবন্ধটি রচিত হয়েছে। নির রোজেন একজন আমেরিকান সাংবাদিক যিনি সাম্প্রতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে লিখে থাকেন। নিউ ইয়র্কার, ও রোলিং স্টোনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তার লেখা ছাপা হয়েছে। তার সাম্প্রতিকতম বই আফটারমাথ ফলোয়িং দ্য ব্লাডশেড অফ আমেরিকাজ ওয়ার্স ইন দা মুসলিম ওয়ার্ল্ড