রবিবার ১৭ই আশ্বিন ১৪২৯ Sunday 2nd October 2022

রবিবার ১৭ই আশ্বিন ১৪২৯

Sunday 2nd October 2022

আন্তর্জাতিক দক্ষিণ এশিয়া

তাজমহল এবং তেজো মহালয়ার রাজনীতি

উগ্র হিন্দুত্ববাদী তৎপরতায় যেসব মুসলিম পূরাকীর্তি ভারতে হুমকির মুখে

২০২২-০৫-৩০

ইরফানুর রহমান রাফিন

ভারতে কি অগণিত বাবরি মসজিদের পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে?

হঠাৎ করেই যেন ভারতের অনেকগুলো পুরাতাত্ত্বিক স্থান নিয়ে একযোগে শোরগোল শুরু হয়েছে! তাজমহল, কুতুব মিনার এর মত জগৎখ্যাত স্থাপনা হোক আর জ্ঞানব্যাপী মসজিদের মত তুলনামূলক কম আলোচিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি হোক—ভারতকে নিয়ে দুনিয়া ব্যাপী এখন যে আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে, সেটা হলো, আমরা কি আরও অনেকগুলো বাবরি মসজিদের পুনরাবৃত্তি দেখতে যাচ্ছি?হিন্দুত্ববাদ ভারত জুড়ে তার অগ্রাভিযানের স্বার্থে ইতিহাসের নিজস্ব ব্যাখ্যাকে চাপিয়ে দিয়ে যে সাম্প্রাদায়িক রক্তপাতের রাজনীতিকে ডেকে আনছে, তার সম্ভাব্য বলি হতে পারে তাজমহলসহ আরও বেশ কয়েকটি মধ্যযুগীয় স্থাপনা। ভারত জুড়ে অজস্র বাবরি মসজিদের আশঙ্কা তাই অমূলক নয়।

 

ভেঙে ফেলা হচ্ছে বাবরী মসজিদ: এই দৃশ্যটি ভারতের রাজনীতিকে স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছিল।
আলোকচিত্র: প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া

 

 

গত ২২ মে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা দিল্লিতে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বলেন, একটা সময় ভারতের সব মুসলমান হিন্দু ছিলেন। তবে তিনি সেইসাথে যোগ করেন, মুসলমানদেরকে রাতারাতি ধর্ম বদলে হিন্দুত্বে আনা সম্ভব নয়। সেই জন্য “নির্দিষ্ট আবহাওয়া আর শিক্ষাব্যবস্থা” দরকার।

 

আসামের মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য নিতান্তই ব্যক্তিগত নয়। অনেকগুলো পুরাতাত্ত্বিক স্থান নিয়ে ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের যেই সাম্প্রদায়িক তৎপরতা, তা থেকে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়। এইসব তৎপরতার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে আছে মসজিদ, ঈদগাহসহ ভারতের মুসলমান শাসকদের তৈরি করা বিভিন্ন স্থাপনা। পুরনো কোন মন্দির ভেঙে এই স্থাপনাগুলো তৈরি করা হয়েছিল এমন ঐতিহাসিকভাবে ভিত্তিহীন কিংবা অপ্রমাণিত দাবি তুলে এবং সেই দাবিগুলোকেই ইতিহাস ধরে নিয়ে তারপর সেই ইতিহাসের ক্ষতিপূরণ হিসেবে এই স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলার বা “সরিয়ে ফেলার” প্রত্যয় ব্যক্ত করার এই বিজেপি রাজনীতি ভারতবর্ষে সংঘাতের আরেকটা অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, এমন আশঙ্কা সকলের।

 

১৯৯২ সালে অযোধ্যার প্রায় ৫০০ বছর পুরনো বাবরি মসজিদ ভাঙা দিয়ে যেই সাম্প্রদায়িক তৎপরতার সূচনা হয়েছিল, আজকে তা ভারতের অনেকগুলো রাজ্যে রীতিমতো মহামারীর আকার ধারণ করেছে।

 

বিজেপির লক্ষ্যবস্তুর মাঝে আছে তেমন কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নিয়ে আমাদের আজকের আলোচনা।

 

 

১. কুতুব মিনার, দিল্লি

 


দিল্লি সালতানাতের ঐতিহ্য ধারণ করছে কুতুব মিনার। আলোকচিত্র: ইন্ডিয়া টুডে

 

 

১১৯২ থেকে ১২২০ সালের মধ্যে দিল্লি সালতানাতের প্রথম শাসক কুতুবুদ্দিন আইবেক ও পরবর্তীতে তাঁর উত্তরসূরী শামসুদ্দিন ইলতুতমিশ দিল্লিতে একটি মিনার নির্মাণ করেন, যা কুতুব মিনার নামে পরিচিত। ১৯৯৩ সালে ইউনেস্কোর মিনারটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য স্থানগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সাম্প্রতিককালে এই কুতুব মিনারও হিন্দুত্ববাদীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

 

২০২২ সালের এপ্রিলে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বিনোদ বনসাল দাবি করেন, কুতুব মিনার আসলে বিষ্ণু স্তম্ভ।  বনসাল আরো দাবি করেন, কুতুবুদ্দিন আইবেক ২৭টি হিন্দু-জৈন মন্দির ভেঙে সেসবের ধবংসাবশেষ দিয়ে তৈরি করেছিলেন এই মিনার। ফলে বনসালের বক্তব্য হল, কুতুব মিনারের স্থলে সেই ২৭টি মন্দির পুনঃনির্মাণ করতে হবে।

 

২০২২ সালে হিন্দু ইউনাইটেড ফ্রন্ট (এইচইউএফ) নামের একটি অপেক্ষাকৃত স্বল্পপরিচিত হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের শত শত কর্মী কুতুব মিনারের নিকট জড়ো হলে সেখানে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

 

 

 

২. তাজমহল, আগ্রা

 

ভারতীয় মুসলিম স্থাপত্যকলার এক বিস্ময়কর নিদর্শন তাজমহল। আলোকচিত্র: কিরনদীপ সিং ওয়ালিয়া/পেক্সেল 

 

মুঘল সম্রাট শাহজাহানের অতুলনীয় কীর্তি তাজমহল ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান হিসেবে স্বীকৃত।  অথচ কোনো প্রমাণ ছাড়াই হিন্দুত্ববাদীরা দাবি করে, সপ্তদশ শতকের এই সমাধিটি একটি হিন্দু মন্দির ভেঙ্গে বানানো হয়েছে।

 

২০১৮ সালে বিজেপি মন্ত্রী বিনয় কার্তিয়ার বলেন, তাজমহলকে দ্রুত তেজ মন্দিরে রূপান্তরিত করা হবে।  যদিও কার্তিয়ার এই হঠকারী মন্তব্য করার আগের বছর আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (এএসআই) আগ্রার এক আদালতকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, তাজমহল মুসলিম স্থাপত্যকলার এক অনুপম নিদর্শন, এটি কথিত শিবমন্দির তেজো মহালয়া ভেঙে বানানো হয়নি।

 

এ বছরের মে মাসে, বিজেপির জনৈক সদস্য তাজমহলের ভূগর্ভস্থ ২২টি কক্ষ খোলার জন্য এএসআইকে বাধ্য করতে আদালতে একটি দরখাস্ত দাখিল করেছিলেন। তার বিশ্বাস, কক্ষগুলোতে হিন্দুদের প্রতিমা আছে, এই সত্য আড়াল করার জন্যই সেগুলো বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় এএসআই জানায়, সেখানে এমন কোনো প্রতিমা নেই, এবং এলাহাবাদ আদালত দরখাস্তটা নাকচ করে দেয়।

 

তবে হিন্দুত্ববাদীরা যে আদালতের রায়ে দমে যাওয়ার পাত্র নয়, সেটা আরেক হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু মহাসভার মুখপাত্র সঞ্জয় জাটের এই বক্তব্য থেকে পরিষ্কার, যেখানে তিনি বলেছেন আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেও প্রয়োজনে তাজমহল ভেঙে সেখানে হিন্দু মন্দিরের অস্তিত্ব থাকার প্রমাণ দেবেন।

 

আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (এএসআই) কর্তৃক নিয়মিত প্রকাশিত নিউজলেটারের জানুয়ারি ২০২২ সংখ্যায় তাজমহলের ভূগর্ভস্থ কক্ষগুলোর কয়েকটি ছবি প্রকাশিত হয়। এএসআই জানায়, এটা তাদের নিয়মিত সংরক্ষণ কাজের অংশ। তারা আরো বলেন, কোনোকিছু লুকিয়ে রাখার জন্য তাজমহলের ভূগর্ভস্থ কক্ষগুলো বন্ধ করে রাখা হয়নি, বন্ধ করে রাখা হয়েছে নিরাপত্তাজনিত কারণে।

 

 

৩. শাহি ঈদগাহ মসজিদ, মথুরা

 

মথুরার শাহি ঈদগা মসজিদ কৃষ্ণ মন্দিরের পাশেই। আলোকচিত্র: নিউজএক্স

 

 

হিন্দু মহাসভার নজর শুধু তাজমহলেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৬৭০ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব মথুরায় শাহি ঈদগাহ মসজিদ নামে একটি মসজিদ বানিয়েছিলেন। কাকতালীয়ভাবে, মসজিদটির অবস্থান শ্রী কৃষ্ণ মন্দিরের পাশে, যে-মন্দিরটি ভগবান শ্রী কৃষ্ণের জন্মস্থানের ওপর নির্মিত বলে হিন্দুরা বিশ্বাস করেন।

 

গত ২৩ মে শাহি ঈদগাহ মসজিদের ‘শুদ্ধি’ চেয়ে দেওয়ানি আদালতে একটি আবেদন করেছে হিন্দু মহাসভা। সংগঠনটির কোষাধ্যক্ষ দিনেশ শর্মা দাবি করেছেন, ঈদগাহ মসজিদ শ্রী কৃষ্ণ জন্মভূমির পবিত্রতা লঙ্ঘণ করে বানানো হয়েছিল। উল্লেখ্য, আবেদনকারীরা যে ১৩.৩৭ একর জমিকে শ্রী কৃষ্ণ জন্মভূমি বলে দাবি করেন, শাহি ঈদগাহ মসজিদ তার ২.৩৭ একর জমির ওপর বানানো।

দিনেশ শর্মা বলেছেন, তারা মসজিদটিকে ‘সরিয়ে ফেলতে’ চান, এবং হিন্দুদের ‘আত্মমর্যাদা পুনর্বহাল’ করতে চান।

 

 

৪. জ্ঞানব্যাপী মসজিদ, বেনারস

 

বেনারসের জ্ঞানব্যাপী মসজিদ। আলোকচিত্র: ডয়েচে ভেলে

 

 

অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ভাঙার ঠিক তিরিশ বছর পর আরেকটি মসজিদের ওপর হিন্দুত্ববাদীদের চোখ পড়েছে: বেনারসের জ্ঞানব্যাপী মসজিদ। তাদের দাবি অনুসারে, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৬৯৯ সালে এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন একটি হিন্দু মন্দির ভেঙে, ষোড়শ শতাব্দীর কাশী-বিশ্বনাথ মন্দির। বর্তমান বেনারসের জ্ঞানব্যাপী মসজিদের পাশে যে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরটি আছে, সেটি ১৭৮০ সালে এক মারাঠা রানীর বানানো।

 

সম্প্রতি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) দাবি তুলেছে, জ্ঞানবাপী মসজিদ কমপ্লেক্সের ভেতরে একটি পুকুরে শিবলিঙ্গ পাওয়া গেছে, যা তাদের মতে মন্দির ভেঙে মসজিদ নির্মাণের দাবি প্রমাণ করে। তবে একটি পানিপূর্ণ বিশাল পাত্রের মাঝে আলোচ্য বস্তুটির অবস্থান, এটা দেখিয়ে মসজিদের পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা বলেছেন এটা আসলে একটা পানির ফোয়ারা, যে কালো বস্তুটিকে শিবলিঙ্গ বলা হচ্ছে সেটি ছিল ফোয়ারার পানির ঝর্নামুখ।

 

জ্ঞানবাপী মসজিদ নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের তৎপরতা নতুন কিছু নয়, এটা শুরু হয়েছিল তিন দশক আগেই। ১৯৯১ সালে অ্যাডভোকেট বিজয় শঙ্কর রাস্তোগি জ্ঞানবাপী মসজিদ ‘সরিয়ে ফেলার জন্য’ আদালতে আবেদন জানিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, যে মন্দির ভেঙে এই মসজিদ বানানো হয়েছে সেটি ২ হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে মহারাজা বিক্রমাদিত্য কর্তৃক নির্মিত।

 

 

৫. ভোজশালা-কামাল মওলা মসজিদ, মধ্যপ্রদেশ

 

 

মধ্যপ্রদেশের ভোজশালা-কামাল মওলা মসজিদ, মধ্যপ্রদেশ। আলোকচিত্র: জনসত্তা


 

মধ্যপ্রদেশের একটি স্থাপনা নিয়ে স্থানীয় হিন্দু আর মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে বিবাদ আছে। হিন্দুরা মনে করে এটি একটি স্বরস্বতী মন্দির। অন্যদিকে মুসলমানদের কাছে এটি কামাল মওলার মসজিদ।

 

আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (এএসআই) এই বিবাদের একটা সমাধান বের করেছিল ভোজশালা-কামাল মওলা মসজিদ নামে পরিচিত এই স্থাপনায় হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের প্রবেশাধিকারকে একটা নিয়মের মধ্যে বেঁধে দিয়ে। তাদের নির্দেশ অনুসারে, হিন্দুরা শুধু স্বরস্বতী পূজার দিন প্রার্থনা করার জন্য ভোজশালায় ঢুকতে পারত। অন্যদিকে, মুসলমানরা প্রতি শুক্রবার দুই ঘন্টা জুমার নামাজ পড়ার জন্য মসজিদটিতে ঢোকার অনুমতি পেত।

 

কিন্তু এ-বছরের মে মাসের শুরুর দিকে হিন্দু ফ্রন্ট ফর জাস্টিস নামের একটি সংগঠন এএসআইয়ের নির্দেশের বিরুদ্ধে একটি জনস্বার্থ মামলা ঠুকে দেয়। মামলার আবেদনে বলা হয়, আলোচ্য স্থাপনাটি দেবী স্বরস্বতীর মন্দির হওয়ায় শুধু হিন্দুদেরই এখানে উপাসনা করার অধিকার রয়েছে। মুসলমানদের এখানে নামাজ পড়ার অধিকার নেই।

 

হিন্দু ফ্রন্ট ফর জাস্টিসের আবেদনে আরো বলা হয়, ১০৩৪ সালে অঞ্চলটির হিন্দু শাসকরা ভোজশালায় দেবী সরস্বতীর একটি মূর্তি স্থাপন করেছিল। তাদের দাবি অনুযায়ী ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশরা এটা লন্ডনে নিয়ে যায়, বর্তমানে যা ব্রিটিশ যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। তাদের দাবি হল, কথিত এই্ মূর্তিটি ফিরিয়ে আনতে হবে, এবং ভোজশালা চত্বরের মধ্যে পুনঃস্থাপিত করতে হবে।

 

২০১৬ সালে স্বামী ভারতী মহারাজ নামের এক সন্ন্যাসী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে একটা খোলা চিঠি লিখে উক্ত স্বরস্বতী মূর্তিটি ফিরিয়ে এনে ভোজশালায় পুনঃস্থাপিত করার আহবান জানিয়েছিলেন।

 

অন্যদিকে ঐতিহাসিকের মতে, সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির প্রশাসক আইনুল মুলক মুলতানি ১৩০৫ সালে সূফি নিজামুদ্দিন আউলিয়ার শিষ্য সূফি কামালুদ্দিন মওলার দরগা হিসেবে এই মসজিদটি প্রথম নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে কোনো কারণে দরগাটি ক্ষয়ে গেলে পঞ্চদশ শতাব্দীতে দেলওয়ার খান ঘুরি নামের এক মুসলমান শাসক দরগাটি পুনর্নিমাণ করে বর্তমান মসজিদের রূপ দেন। এই পুনর্নিমার্ণের কাজে অঞ্চলটিতে থাকা নানান হিন্দু ও জৈন স্থাপনার উপাদান ব্যবহার করা হয়েছিল।

আগামী ২৭ জুন মামলার কার্যক্রম শুরু হবে।

 

 

স্থান নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের এই তৎপরতার মূলে কী?

 

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের জন্য লেখা সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে প্রতাপ ভানু মেহতা পরিষ্কারভাবে বলেছেন, মথুরা আর কাশীর মসজিন নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের যে তৎপরতা, তার মূলে ধার্মিকতা নেই। ভগবান শিব বা কৃষ্ণের সাথে কোনোপ্রকার আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করা হিন্দুত্ববাদীদের উদ্দেশ্য নয়। হিন্দুত্ববাদীদের উদ্দেশ্য হচ্ছে সংখ্যালঘুদেরকে চাপের মধ্যে রাখা, এবং এই লক্ষ্যে ধর্মানুভূতির ব্যবহার।

 

রুটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশীয় ইতিহাসের সহযোগী অধ্যাপক অদ্রে ত্রুশকার মতে, তাজমহল নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের দাবির ঠিক ততটা গুরুত্ব আছে, ঠিক যতটা গুরুত্ব আছে পৃথিবী সমতল এই দাবিটার।  ত্রুশকা মনে করেন, তাজমহল নিয়ে এই তৎপরতার পেছনে কোনো সুসঙ্গত তত্ত্ব নেই।  যা আছে, তা হল অহিন্দু কোনোকিছুকে ভারতীয় বলে মেনে না নেয়ার আকাঙ্ক্ষা, আর ভারতীয় ঐতিহ্য থেকে মুসলমানদের অবদানগুলোকে মুছে ফেলা।

 

১৯৪৭ সালে ভারত অন্তত সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ একটি রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। সামাজিক সাংস্কৃতিক স্তরে জাতপাত আর সাম্প্রদায়িকতার প্রকোপ যতোই থাকুক না কেন, রাষ্ট্র পর্যায়ে দেশটিকে ধর্মনিরপেক্ষই ভাবা হয়। হিন্দুত্ববাদ সেই ভাবনাটাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে, এবং মুসলমানদের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা নিয়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদের যে ভয়াবহ সংখ্যাগুরুবাদী তৎপরতা, তা দেশটির সংখ্যালঘু মুসলমান নাগরিকদেরকে ক্রমাগতভাবে কোনঠাসা করার পাশাপাশি খোদ রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ দাবিটাকেই অর্থহীন করে তুলছে।

 

আপাতত বিজেপির প্রধান নেতারা এই আন্দোলনের নেতৃত্বে না থাকলেও তারা এক একটা রাজ্য জুড়ে এই তৎপরতার পেছনে জোরেশোরেই ভূমিকা রাখছেন। এমনকি ভারতে ‘গদিমিডিয়া’ নামে পরিচিত সরকারপন্থী গণমাধ্যমগুলো প্রায় প্রতিটা প্রত্মতাত্ত্বিক স্থান নিয়ে ওঠা গোলমালে জনতুষ্টিবাদী অবস্থান নিয়েছে এবং ভারতের মুসলিম ইতিহাসকে নিষ্ঠুর, মন্দির ধ্বংসকারী, হিন্দুত্বের অবমাননকারী হিসেবে চিহ্নিত করে সংবাদ, আলোচনা অনুষ্ঠান ও প্রতিবেদন প্রচার করছে। অন্যিদকে ভারতেরই গনতন্ত্রমনা গণমাধ্যমের দিক থেকে এগুলোর প্রতিবাদও প্রচারিত হচ্ছে। কিন্তু বাবরী মসজিদের আমল থেকেই বিজেপি খুব ভালো করেই জানে, রক্তপাত ও সহিংসতা ঘটিয়ে বিভাজনের প্রেক্ষিত তৈরি করতে পারলে তার বিজেপি শাসনের অজস্র ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সঙ্কট, কোভিড বিপর্যয়কে ভুলিয়ে হিন্দু মুসলিম, প্রগতিশীল-হিন্দুত্ববাদী ইত্যাদি বিভাজনে দেশবাসীকে সফলভাবে ভাগ করতে পারবে।

 

আপাতত তাই বিজেপির প্রধান নেতারা এই কাজে নামছেন না, কিন্তু তারা খুব সতর্কভাবেই আয়োজনটা সম্পন্ন করছেন। পুরো ভারত জুড়ে তেমন একটি বিভাজনের প্রেক্ষিত তৈরি হয়ে গেলে তখন ‘জনপ্রিয়’ দাবির পক্ষে থাকার অজুহাতে নিজেরাই নেমে পরা যাবে ভারতের ইতিহাসের ওপর অস্ত্রপচার করে ইতিহাসকে নিজের মত ঢেলে সাজাবার যুদ্ধে, এবং অভুক্ত জনগোষ্ঠীকে সেই যুদ্ধের সৈনিক হিসেবে নামিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব হবে।

 

প্রত্মতাত্ত্বিক স্থান নিয়ে এই যাবতীয় শোরগোল আসলে ভারতের রাজনৈতিক রুগ্নতারই বহিঃপ্রকাশ।